ট্রেজারি ইয়েল্ড ২৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ: বাংলাদেশের জন্য সতর্ক সংকেত
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১০-বছর মেয়াদি ট্রেজারি ইয়েল্ড ৫.৩৪ শতাংশ ছুঁয়েছে, যা ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ। এটি ২০০৭-২০০৮ গ্লোবাল ফাইনানশিয়াল ক্রাইসিস-পর্বের উচ্চতাকেও অতিক্রম করেছে। ৩০-বছর মেয়াদি ট্রেজারি ইয়েল্ডও প্রায় ৫.৬২ শতাংশে উঠেছে।
এটি শুধু আমেরিকার বন্ড মার্কেটের খবর নয়। এর অভিঘাত ডলার, বৈশ্বিক পুঁজি, আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির ওপরও পড়তে পারে।
আমার আশঙ্কা স্পষ্ট: যদি এখনই সতর্ক, সমন্বিত এবং বিশ্বাসযোগ্য নীতিপদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
ট্রেজারি ইয়েল্ড বাড়লে ডলার-ভিত্তিক নিরাপদ সম্পদ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। এতে বৈশ্বিক পুঁজি তুলনামূলক ঝুঁকিপূর্ণ বাজার থেকে ডলারমুখী হওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে।
এর মানে এই নয় যে ইয়েল্ড বাড়লেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে টাকা দুর্বল হবে। কিন্তু ডলারের চাহিদা বাড়লে ইমার্জিং মার্কেটের মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক।
বাংলাদেশের মতো আমদানি-নির্ভর অর্থনীতিতে সেই চাপ জ্বালানি, খাদ্য, সার, ওষুধের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও পরিবহন ব্যয়ের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছে যায়। নিত্যপণ্যের বাজারে এর প্রভাব অনেক সময় আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করে।
টাকার অবমূল্যায়ন মানে শুধু বিনিময় হার বদলানো নয়:
ধরা যাক, আন্তর্জাতিক বাজারে এক ব্যারেল তেলের দাম ১০০ মার্কিন ডলারই রইল। কিন্তু একই সময়ে টাকার বিপরীতে ডলারের মূল্য ১০ শতাংশ বেড়ে গেল। সে ক্ষেত্রে শুধু এক্সচেঞ্জ রেটের কারণেই সেই তেল আমদানিতে টাকার খরচ বেড়ে যাবে।
একই যুক্তি বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ডলার শক্তিশালী হলে ঋণপরিশোধের চাপ বাড়ে, নতুন বৈদেশিক ঋণের খরচ বাড়ে, আর বেসরকারি খাতের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।
এর সঙ্গে পরিবহন, জ্বালানি ও উৎপাদন ব্যয় যুক্ত হলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বহু পণ্যের দামেও দ্বিতীয় দফায় প্রভাব পড়ে। তাই টাকার অবমূল্যায়ন শেষ পর্যন্ত পরিবারের মাসিক বাজেটের বিষয়।
ব্যাংকে ১০ শতাংশ সুদ পেলেই কি আপনি বাস্তবে লাভ করছেন?
ধরা যাক, আপনি টাকায় ১০ শতাংশ সুদে একটি ফিক্সড ডিপোজিট করলেন। একই সময়ে ডলারের বিপরীতে টাকা ১০ শতাংশ দুর্বল হলো। সে ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে আপনার রিটার্ন কার্যত শূন্যের কাতারে নেমে আসে।
তার ওপর যদি একই সময়ে মূল্যস্ফীতির চাপও থাকে, তাহলে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার বিচারে আপনার সঞ্চয়ের বাস্তব রিটার্ন আরও ক্ষয়ে যেতে পারে।
অর্থাৎ নামমাত্র সুদ আর প্রকৃত আর্থিক সুরক্ষা এক জিনিস নয়। এই পার্থক্য না বুঝলে আমানতকারী, বিনিয়োগকারী এবং নীতি নির্ধারক—তিন পক্ষই ভুল আত্মতুষ্টিতে ভুগতে পারেন।
২০২২-এর মার্চের শিক্ষা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না:
মার্চ ২০২২-এর এক ডলারের মূল্য ছিল প্রায় ৮৬ টাকা। এখন তা প্রায় ১২৩ টাকা। অর্থাৎ এক ডলার কিনতে প্রয়োজনীয় টাকার পরিমাণ প্রায় ৪৩ শতাংশ বেড়েছে।
সেই সময় মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ দ্রুত সুদের হার বাড়িয়েছিল, আর বাংলাদেশ একই সঙ্গে রিজার্ভে, এক্সচেঞ্জ রেট, আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির তীব্র চাপের মুখে পড়ে।
নীতিগত প্রাসঙ্গিকতায় বন্ড মার্কেটের খবর নয়। এর অভিঘাত ডলার, বৈশ্বিক পুঁজি, আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির ওপরও পড়তে পারে।
ইতিহাস হুবহু পুনরাবৃত্তি হয় না, কিন্তু একই ধরনের বৈশ্বিক চাপ ফিরে এলে আগেভাগে প্রস্তুত না থাকার মূল্য অনেক বেশি হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিক্রিয়া কি যথেষ্ট দ্রুত?
বাংলাদেশ ব্যাংক জুলাইয়ে পলিসি রেট ১০ শতাংশ থেকে ৯.৫ শতাংশে নামিয়েছে এবং সর্বশেষ সিদ্ধান্তেও ৯.৫ শতাংশেই রেখেছে।
প্রশ্ন হলো, দীর্ঘমেয়াদী মার্কিন ট্রেজারি ইয়েল্ড যখন প্রায় আড়াই দশকের সর্বোচ্চ, ডলার শক্তিশালী, আর আমদানি-নির্ভর মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়ছে, তখন এই অবস্থান কি যথেষ্ট সতর্কতামূলক?
এর উত্তর শুধু “সুদের হার বাড়ান” এত সরল নয়। প্রবৃদ্ধি, প্রাইভেট ক্রেডিট, রিজার্ভ, এক্সচেঞ্জ রেট, তারল্য, সরবরাহব্যবস্থা এবং আমদানি ব্যয়—সবকিছুই বিবেচনায় নিতে হবে। কিন্তু বড় প্রশ্ন রয়ে যায়: সাধারণ মানুষকে কি এই বৈশ্বিক ঝুঁকি ও সম্ভাব্য মূল্যস্ফীতির চাপ সম্পর্কে যথেষ্ট দ্রুত ও পরিষ্কারভাবে সতর্ক করা হচ্ছে?
লেখক: অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. সায়েম আমীর ফয়সল




Comments