Image description

মফস্বলের সাংবাদিকরা কি এই দেশের গণমাধ্যমের সন্তান, নাকি কেবল প্রয়োজনের সময় ব্যবহারযোগ্য শ্রমিক?প্রশ্নটি কঠিন। কিন্তু বাস্তবতা আরও কঠিন।
জাতীয় গণমাধ্যমের পাতায় প্রতিদিন যে সংবাদ ছাপা হয়, টেলিভিশনের পর্দায় যে প্রতিবেদন প্রচারিত হয় কিংবা অনলাইন পোর্টালে যে খবর লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়—তার বড় একটি অংশের সূত্রপাত হয় মফস্বলের কোনো অখ্যাত রাস্তা, বাজার, ইউনিয়ন, গ্রাম কিংবা প্রত্যন্ত জনপদ থেকে। সেই সংবাদ সংগ্রহ করেন মফস্বল সাংবাদিকরা।
তাঁরা থাকেন ঘটনাস্থলে। তাঁরা দেখেন মানুষের দুর্ভোগ। তাঁরা স্থানীয় ক্ষমতার চরিত্র চেনেন। তাঁরা জানেন কোথায় অনিয়ম, কোথায় দখল, কোথায় দুর্নীতি, কোথায় মানুষের অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—এই সাংবাদিকের নিজের নিরাপত্তা নিয়ে যেন কারও তেমন মাথাব্যথা নেই। সত্য প্রকাশের মূল্য এত বেশি কেন?
 
একজন মফস্বল সাংবাদিক যখন কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে সংবাদ করেন, তখন তিনি শুধু একটি সংবাদ প্রকাশ করেন না; অনেক সময় নিজের সামাজিক নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলেন। কারণ তাঁর কর্মক্ষেত্রই তাঁর বসবাসের জায়গা।
যাঁর বিরুদ্ধে সংবাদ করলেন, পরদিন তাঁর সঙ্গেই হয়তো একই বাজারে দেখা হবে। তাঁর পরিবার একই এলাকায় বসবাস করে। সন্তান একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়তে পারে। আত্মীয়স্বজন একই সামাজিক পরিসরে চলাফেরা করেন।
তাহলে প্রশ্ন হলো—একজন সাংবাদিককে সত্য প্রকাশের জন্য কি নিজের পরিবারকেও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে হবে? রাষ্ট্র কি শুধু নাগরিকের নিরাপত্তার কথা বলবে, নাকি সত্য প্রকাশের কারণে ঝুঁকিতে পড়া সাংবাদিকের নিরাপত্তার কথাও ভাববে?
ক্ষমতার কাছে সাংবাদিকতা কি জবাবদিহি করবে, নাকি সাংবাদিকই ক্ষমতার কাছে জবাবদিহি করবে? মফস্বলের বাস্তবতায় একটি ভয়ংকর প্রবণতা দৃশ্যমান—কিছু প্রভাবশালী মহল সাংবাদিকতার ওপর অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তাঁদের পছন্দের সংবাদ হলে সাংবাদিক ‘ভালো’। অপছন্দের সংবাদ হলে সাংবাদিক ‘ষড়যন্ত্রকারী’।
কেউ কেউ মনে করেন, তাঁদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের আগে সাংবাদিককে অনুমতি নিতে হবে। কেউ আবার ব্যক্তিগত সম্পর্ক, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা সামাজিক প্রভাব ব্যবহার করে সংবাদ থামানোর চেষ্টা করেন।
এখানেই মূল প্রশ্নটি আসে— সাংবাদিক কি ক্ষমতাবানদের মন রক্ষা করবেন, নাকি জনগণের জানার অধিকার রক্ষা করবেন? আমাদের অবস্থান পরিষ্কার—সাংবাদিকতার জবাবদিহি জনগণের কাছে, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কাছে নয়।
সাংবাদিকের ক্যামেরাকে রাজনৈতিক অস্ত্র বানানো হচ্ছে কেন? বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরেক ধরনের বিপজ্জনক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।
পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় কোনো রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি বা সামাজিক ব্যক্তিত্বের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাংবাদিকের ছবি তুলে ধরে তাঁকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষের লোক হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।
একটি ছবি—তারপর অপপ্রচার। অপপ্রচার—তারপর জনরোষ। জনরোষ—তারপর সামাজিক চাপ। এ কেমন পরিবেশ তৈরি করছি আমরা?
একজন সাংবাদিক যদি সব রাজনৈতিক ও সামাজিক পক্ষের অনুষ্ঠানে সংবাদ সংগ্রহ করতে না পারেন, তাহলে তিনি সংবাদ সংগ্রহ করবেন কীভাবে?
সাংবাদিকের কাজ কারও সঙ্গে রাজনৈতিক মিত্রতা করা নয়; সাংবাদিকের কাজ হলো ঘটনাস্থলে থাকা এবং সত্য তুলে ধরা।
‘কার্ড’ কি সাংবাদিকতার লাইসেন্স?
মফস্বল সাংবাদিকতার আরেকটি গভীর ক্ষত হলো পরিচয়পত্রের বাণিজ্য। নামসর্বস্ব কিছু গণমাধ্যম কিংবা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের পরিচয়পত্র হাতে নিয়ে অনেকেই সাংবাদিকতার মাঠে নামছেন। সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণ নেই, নৈতিকতার ধারণা নেই, তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস নেই—কিন্তু পরিচয় আছে।
এর ফলে কী হচ্ছে?
একজন প্রকৃত সাংবাদিকের বছরের পর বছর তৈরি করা পেশাগত বিশ্বাসযোগ্যতা কয়েকজন অপেশাদারের কর্মকাণ্ডে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
তাই সরাসরি প্রশ্ন— সাংবাদিকতার পরিচয় কি বিক্রির পণ্য হতে পারে? যদি না পারে, তাহলে এই কার্ড বাণিজ্য বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ কোথায়?অর্থনৈতিক শোষণ বন্ধ হবে কবে? মফস্বল সাংবাদিকদের দিয়ে নিয়মিত সংবাদ নেওয়া হবে, কিন্তু নিয়মিত সম্মানী দেওয়া হবে না—এ সংস্কৃতি কতদিন চলবে?
একজন সাংবাদিক নিজের অর্থে মোটরসাইকেলে ঘটনাস্থলে যাবেন, নিজের খরচে ছবি তুলবেন, তথ্য সংগ্রহ করবেন, রাত জেগে সংবাদ পাঠাবেন; অথচ মাস শেষে তাঁর প্রাপ্য সম্মানী অনিশ্চিত থাকবে—এটি কি পেশাগত সম্পর্ক, নাকি এক ধরনের অর্থনৈতিক বৈষম্য?
গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে প্রশ্ন থাকতেই পারে— একজন সাংবাদিকের শ্রমের মূল্য যদি প্রতিষ্ঠান দিতে না পারে, তাহলে তাঁর কাছ থেকে পেশাদারিত্বের সর্বোচ্চ মান কীভাবে প্রত্যাশা করা হয়?
বিপদের সময় প্রতিষ্ঠান কোথায়? সংবাদ প্রকাশের সময় সাংবাদিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি। কিন্তু হামলা হলে? মামলা হলে? হুমকি এলে? তখন কি তিনি একই প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি থাকেন?
যদি একজন সাংবাদিক বিপদের মুহূর্তে নিজের মামলা নিজেকেই লড়তে হয়, চিকিৎসার ব্যয় নিজেকেই বহন করতে হয় এবং নিরাপত্তার জন্য নিজেকেই দৌড়াতে হয়, তাহলে ‘প্রাতিষ্ঠানিক সাংবাদিকতা’ শব্দটির অর্থই বা কী?
এ প্রশ্নের উত্তর গণমাধ্যম মালিকদেরও দিতে হবে, সম্পাদকদেরও দিতে হবে।
উন্নয়নের কৃতিত্ব কার? একটি রাস্তা সংস্কার হলো। একটি ব্রিজ নির্মাণ হলো। নদীভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়া হলো। হাসপাতালের সমস্যা সমাধান হলো।
উদ্বোধনের মঞ্চে জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতারা থাকেন। ক্যামেরার সামনে বক্তব্য হয়। ব্যানার ওঠে। ফিতা কাটা হয়।
কিন্তু যে সাংবাদিক প্রথম সমস্যাটি তুলে ধরেছিলেন, তাঁর নাম কোথায়? এই প্রশ্নটি আমরা প্রায়ই ভুলে যাই।
মফস্বল সাংবাদিকরা উন্নয়নের কৃতিত্ব চান না। তাঁরা চান তাঁদের কাজের স্বীকৃতি, নিরাপত্তা এবং পেশাগত মর্যাদা। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়
মফস্বল সাংবাদিকতার সংকটকে আর বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি গণমাধ্যমের কাঠামোগত সংকট।
রাষ্ট্রকে দায়িত্ব নিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানকে সাংবাদিকের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে মাঠপর্যায়ের প্রতিনিধিদের জন্য ন্যূনতম সম্মানী, প্রশিক্ষণ, বীমা ও আইনি সহায়তার কাঠামো তৈরি করতে হবে।
একই সঙ্গে সাংবাদিকদেরও আত্মশুদ্ধির পথে হাঁটতে হবে। সাংবাদিকতার পরিচয়কে ব্যক্তিগত সুবিধা, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা আর্থিক স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার বানানো যাবে না।
কারণ সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় পুঁজি কোনো প্রেস কার্ড নয়—বিশ্বাসযোগ্যতা।
শেষ প্রশ্নটি রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে আমরা কি এমন একটি দেশ চাই, যেখানে একজন সাংবাদিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে লিখবেন, কিন্তু তাঁর নিজের নিরাপত্তা থাকবে না?
আমরা কি এমন একটি গণমাধ্যম চাই, যেখানে সংবাদ সংগ্রহের সময় সাংবাদিক প্রতিষ্ঠানের, কিন্তু বিপদের সময় তিনি একা? আমরা কি এমন সাংবাদিকতা চাই, যেখানে সত্য প্রকাশের চেয়ে ক্ষমতাবানকে সন্তুষ্ট রাখা নিরাপদ? যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে এখনই পরিবর্তন দরকার।
মফস্বল সাংবাদিকদের নিরাপত্তা কোনো দয়া নয়। সম্মানী কোনো অনুগ্রহ নয়। পেশাগত মর্যাদা কোনো উপহার নয়। এসব তাঁদের ন্যায্য অধিকার।
মফস্বলের সাংবাদিককে দুর্বল করে কোনো গণমাধ্যম শক্তিশালী হতে পারে না। সাংবাদিককে ভয় দেখিয়ে কোনো গণতন্ত্র শক্তিশালী হতে পারে না। আর সত্যকে চেপে রেখে কোনো সমাজ দীর্ঘদিন সুস্থ থাকতে পারে না।
মফস্বলের সেই নীরব সাংবাদিকের হাতে থাকা কলমটি তাই শুধু একটি কলম নয়—এটি জনতার কণ্ঠস্বর। সেই কণ্ঠস্বরকে নিরাপদ রাখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, গণমাধ্যমের এবং সর্বোপরি আমাদের সবার।