৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা পাওনা, জমিসহ সম্পদের হিসাব চাই
রাজশাহী জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নে জরুরি সাধারণ সভা ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দাবি
রাজশাহী জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ শ্রমিকদের প্রায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা পাওনা পরিশোধ, ২০১৯ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সংগঠনের আয়-ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ এবং জরুরি সাধারণ সভা আহ্বানের দাবি জানিয়েছেন চাঁদা প্রদানকারী নিয়মিত সদস্যরা। একই সঙ্গে সাধারণ শ্রমিকদের অংশগ্রহণে নতুন নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন এবং ইউনিয়নের ছয় কাঠা জমির ওপর নির্মিত দুইতলা হোটেল গোল্ডেন স্টারসহ সংগঠনের সম্পদের হিসাব ও মালিকানা স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সোমবার (৫ অক্টোবর) রাজশাহীর নওদাপাড়া আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানান ইউনিয়নের সাধারণ শ্রমিক ও নেতারা। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সাধারণ শ্রমিক মো. স্বপন ইসলাম। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন রাজশাহী জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের কোষাধ্যক্ষ মো. জহুরুল ইসলাম জনি।
শ্রমিকদের অভিযোগ, ২০১৯ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ইউনিয়নের কোনো সাধারণ সভা হয়নি। একই সময়ে সংগঠনের আয়-ব্যয়ের হিসাবও সাধারণ সদস্যদের সামনে উপস্থাপন করা হয়নি। এমনকি শ্রম পরিচালকের কাছে নিয়মিত আয়-ব্যয়ের হিসাব ও নিরীক্ষা প্রতিবেদন দাখিল করা হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তারা।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা দাবি করেন, বিগত কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের বিরুদ্ধে ইউনিয়নের অর্থ লুটপাট ও আত্মসাৎ এবং শ্রমিকদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে ওই কমিটির নেতারা ইউনিয়ন থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন বলেও দাবি করেন তারা।
আগে হিসাব, পরে নির্বাচন
সাধারণ শ্রমিকরা বলেন, সাধারণ সভা না করে এবং সদস্যদের মতামত উপেক্ষা করে নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হলে তা তারা মেনে নেবেন না। তাদের দাবি, আগে সাধারণ সভা করে ইউনিয়নের আয়-ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব দিতে হবে। এরপর সাধারণ শ্রমিকদের মতামতের ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করে নির্বাচন দিতে হবে।
বর্তমান নির্বাচন কমিশনারের প্রতিও অনাস্থা প্রকাশ করেন তারা। শ্রমিকদের দাবি, নির্বাচনের আগে জরুরি সাধারণ সভা আহ্বান করে সেখানে সংগঠনের আর্থিক হিসাব-নিকাশ উপস্থাপন করতে হবে। তাদের ভাষ্য, গঠনতন্ত্র অনুসরণ না করে নির্বাচন আয়োজনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হলে তা শ্রমিকরা মেনে নেবেন না।
শ্রমিকের পাওনা আগে
সংবাদ সম্মেলনে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, ইউনিয়নের তহবিলে থাকা অর্থ থেকে দীর্ঘদিনের বিভিন্ন পাওনা দ্রুত পরিশোধ করতে হবে। এর মধ্যে কন্যাদায় সহায়তা, মৃত্যুকালীন অনুদান, সন্তানদের শিক্ষা ভাতা, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত শ্রমিকদের চিকিৎসা ব্যয় এবং পঙ্গু, অসহায় ও বয়োজ্যেষ্ঠ শ্রমিকদের ভাতার বিষয়টি অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
বক্তারা বলেন, শ্রমিকরা নিয়মিত চাঁদা দিয়ে ইউনিয়নের তহবিল গড়ে তুলেছেন। তাই সেই অর্থের ব্যবহারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং প্রকৃত সুবিধাভোগী শ্রমিকদের প্রাপ্য বুঝিয়ে দেওয়া সংগঠনের দায়িত্ব।
ছয় কাঠা জমি ও হোটেলের হিসাব দাবি
ইউনিয়নের ছয় কাঠা জমির ওপর নির্মিত দুইতলা হোটেল গোল্ডেন স্টার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সাধারণ শ্রমিকরা। তাদের দাবি, ইউনিয়নের জমি ও অন্যান্য সম্পদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা, মালিকানা এবং আয়-ব্যয়ের হিসাব সদস্যদের সামনে প্রকাশ করতে হবে। একই সঙ্গে ছয় কাঠা জমি সংগঠনের কাছে ফেরত দেওয়ার দাবিও জানান তারা।
শ্রমিক নেতারা বলেন, ইউনিয়নের সম্পদ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। এগুলো সাধারণ শ্রমিকদের চাঁদা ও শ্রমের মাধ্যমে গড়ে ওঠা সংগঠনের সম্পদ। ফলে এসব সম্পদের ব্যবস্থাপনা ও ব্যবহারেও শ্রমিকদের অংশগ্রহণ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
দাবি বাস্তবায়ন না হলে কঠোর আন্দোলন
সংবাদ সম্মেলনে শ্রমিকরা বলেন, তাদের দাবিগুলো কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থের জন্য নয়; বরং সাধারণ শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ও সংগঠনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য। জরুরি ভিত্তিতে দাবি বাস্তবায়ন করা না হলে কঠোর আন্দোলন কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তারা।
শ্রমিকদের অভিযোগ ও সাধারণ সভা আহ্বানের দাবির বিষয়ে রাজশাহী জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) বেলায়েত হোসেন বলেন, সাধারণ সভা বা হিসাব-নিকাশের বিষয়ে আমার আসলে এখতিয়ার নেই। শ্রমিকদের মধ্যে দুটি পক্ষ রয়েছে। একটি পক্ষ নির্বাচন চায়, অন্য পক্ষ নির্বাচন চায় না। তবে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে এসব বিষয়ে সমাধান আসবে। সে জন্যই নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়েছে। মূলত নির্বাচন হলেই সবকিছুর সমাধান হবে।
সংবাদ সম্মেলনে মো. মনজুর আলী, মো. জুয়েল, মো. স্বপন, মো. রানটু, মো. শামীম, মো. সাদ্দাম, মো. তরিকুল, রাশেদুল, হায়দারসহ রাজশাহী জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের অসংখ্য সাধারণ শ্রমিক উপস্থিত ছিলেন।
এসএ




Comments