নথিতে ‘বাগান’ দেখিয়ে ১২৭ ফুটের পাহাড় সাবাড়, গড়ে উঠছে বহুতল ইমারত
নথিতে দেখানো হয়েছে 'বাড়ি ও বাগান'। বাস্তবে খাড়া ১২৭ ফুট পাহাড়। এই জালিয়াতিকে ঢাল বানিয়ে নগরের আশকারদিঘী পাড়ে গিলে খাওয়া হচ্ছে সুবিশাল পাহাড়ি জমি। জেলা প্রশাসনের ঝটিকা অভিযান, শ্রমিক আটক কিংবা পরিবেশ অধিদপ্তরের মামলা—কোনো কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না পাহাড়খেকোদের। আদালতের রিট আর ‘আইনি জটিলতার’ দোহাই দিয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নাকের ডগায় রাতের আঁধারে প্রকাশ্যেই বহুতল ভবন নির্মাণের বেপরোয়া প্রতিযোগিতা চালাচ্ছে ‘স্বপ্নীল ফ্যামিলি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন’ নামের একটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান। সিডিএর অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশ এবং নীতিনির্ধারকদের ঢিলেঢালা ভূমিকায় দিনে দিনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী এই পাহাড়টি।
টিনের বেড়ার আড়ালে রাতের ‘অপারেশন’
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দিনে কাজ বন্ধের ভান করা হলেও রাত গভীর হলেই সক্রিয় হয়ে ওঠে একাধিক এস্কেভেটর (মাটি কাটার যন্ত্র)। চারপাশ উঁচু টিনের বেড়ায় ঘিরে ভেতরে চলে পাহাড় কাটা ও বেজমেন্ট ঢালাইয়ের কাজ। ট্রাকভর্তি করে সরানো হয় কাটা মাটি। সিডিএর চোখ ফাঁকি দিতে বাড়তি মজুরিতে দক্ষ শ্রমিক চুক্তি করে গত এক মাস ধরে গভীর রাতে এভাবে পাহাড় উজাড় করে চলছে ভবন নির্মাণ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আশকারদিঘী পাড়ের এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘দিনের বেলায় মনে হবে সব শান্ত। রাত ১২টার পর টিনের ঘেরাওয়ের ভেতর এস্কেভেটরের শব্দ শুরু হয়। পাহাড় কেটে ট্রাকে করে মাটি বাইরে পাঠানো হয় আর একই সঙ্গে চলে ঢালাইয়ের কাজ।’
পাহাড় যেভাবে হলো ‘বাড়ি ও বাগান’
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২০ সালের ২৩ জানুয়ারি ৯২ জন ব্যক্তির নামে জমিটি নামজারি (মিউটেশন) করা হয়। সিডিএ ও ভূমি রেজিস্ট্রি দপ্তরে জমা দেওয়া নথিতে জমিটির শ্রেণি উল্লেখ করা হয়েছে ‘বাড়ি ও বাগান’। অথচ বাস্তবে স্থানটি ১২৭ ফুট উঁচু একটি খাড়া পাহাড়।
১৯৯৫ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইন এবং ২০১০ সালের সংশোধিত আইন অনুযায়ী, প্রাকৃতিক জলাধার ও পাহাড় কাটা বা শ্রেণি পরিবর্তন করা পুরোপুরি নিষিদ্ধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ।
নথিতে শ্রেণি পরিবর্তনের এই কারসাজির কারণে পরিবেশ অধিদপ্তর আইনি পদক্ষেপ নিতে গিয়ে জটিলতায় পড়েছে। পাহাড়কে কাগজে-কলমে ‘বাড়ি’ দেখিয়ে সিডিএর অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে ভবন নির্মাণের অনুমোদন বাগিয়ে নেওয়া হয়—উঠেছে এমন অভিযোগ।
৮৭ শর্তের সব ভঙ্গ, সিডিএর ‘আইওয়াশ’ অভিযান
২০২৩ সালের ১৩ এপ্রিল সিডিএর ইমারত নির্মাণ কমিটির কাছ থেকে ৩০ কাঠা জমিতে তিনটি বেজমেন্টসহ ১৭ তলা আবাসিক ভবনের নকশা অনুমোদন নেয় প্রতিষ্ঠানটি। তবে অনুমোদনের ক্ষেত্রে জমির ৬০ শতাংশ খালি রাখা এবং কোনো অবস্থাতেই পাহাড় না কাটাসহ ৮৭টি কঠোর শর্ত বেঁধে দিয়েছিল সিডিএ।
বাস্তবে এসব শর্তের একটিও মানা হয়নি। উল্টো পাহাড় কেটে ইতোমধ্যে সাত তলা পর্যন্ত অবকাঠামো নির্মাণ শেষ করা হয়েছে।
আইন লঙ্ঘনের এই চিত্র নিয়ে সমালোচনা বাড়লে ২০২৫ সালের ২১ এপ্রিল সিডিএ চেয়ারম্যান সরেজমিন পরিদর্শনে যান। তবে সেই অভিযানকে 'লোকদেখানো' বলেই মনে করেন স্থানীয়রা।
অভিযোগ রয়েছে, সিডিএ কেবল সামনের টিনের বেড়া ও দুটি পিলারের সামান্য অংশ ভেঙে দিয়ে চলে আসে। এরপর কিছুদিন কাজ বন্ধ থাকলেও সিডিএকে 'ম্যানেজ' করে পুনরায় রাতের আধারে কাজ শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি।
আটক, মামলা ও উচ্চ আদালতের রিটের খেলা
এর আগে ২০২৫ সালের ২৬ মার্চ জেলা প্রশাসন অভিযান চালিয়ে পাহাড় কাটার দায়ে ১৯ জন শ্রমিককে আটক করেছিল। এরপর ২৮ মার্চ ৯২ জন জমি মালিকের বিরুদ্ধে মামলা করে খোদ পরিবেশ অধিদপ্তর। অন্যদিকে কাজ টিকিয়ে রাখতে সিডিএর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট আবেদন (পিটিশন নম্বর: ৪৬৫২/২০২৪) করে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানটি।
২০২৫ সালের ২০ এপ্রিল হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ রিটের ওপর আট সপ্তাহের স্থগিতাদেশ দেন। এই আইনি আদেশ ও নথির ফাঁকফোকরকে পুঁজি করেই মূলত নির্বিঘ্নে পাহাড় কেটে চলেছে সংঘবদ্ধ চক্রটি।
পাহাড় কেটে ভবন নির্মাণের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বপ্নীল ফ্যামিলি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি হিমেল দাশ বলেন, ‘আমাদের করা মামলা আদালতে চলমান রয়েছে। আমরা আইন মেনেই সবকিছু করছি। কখনও কাজ হচ্ছে, কখনও বন্ধ থাকছে। আমরা সুনামের সঙ্গে বসবাস করি, সেটি তো নষ্ট করতে পারি না।’
তবে সিডিএর ইমারত নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ শাখার অথরাইজড অফিসার-২ তানজিব হোসেন বলেন, ‘ভবনটি নিয়ে আদালতে একটি মামলা ছিল। ২০২৪ সালে সেটি খারিজ হয়েছিল বলে জানি। বর্তমানে নতুন মামলার হালনাগাদ তথ্য আমার জানা নেই। আর সেখানে আবার কাজ শুরু হয়েছে—এমন কোনো তথ্যও আমাদের কাছে নেই।’
সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. বেলায়েত হোসেন সিডিএর সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘স্বপ্নীল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মামলাটি আদালতে বিচারাধীন। মামলার কারণে অনেক সময় সরাসরি কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। আমি সম্প্রতি ঘটনাস্থলে গিয়ে সিমেন্টের বস্তার সংখ্যা গুনে এসেছি। আসা-যাওয়ার পথেও নজরে রাখি। তাদের কোনো কাজ করার সুযোগ নেই। কাগজের জটিলতার কারণে সরাসরি নিষেধ করা না গেলেও আমি কাজ বন্ধ রাখতে কঠোর নির্দেশ দিয়েছি।’
এসএ




Comments