ইউরোপে উন্নত জীবন, ভালো আয় ও স্থায়ীভাবে বসবাসের স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমান অনেক বাংলাদেশি। কেউ বৈধ পথে যান, কেউ আবার দালালের মাধ্যমে বিপজ্জনক সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশ করেন। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর পর সবার স্বপ্ন পূরণ হয় না। বৈধভাবে বসবাসের অনুমতি না থাকা, আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যান হওয়া কিংবা প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অভাবে অনেককে দেশে ফিরতে হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোর ঘটনা আবারও আলোচনায় এসেছে। ২৩ অক্টোবর ইতালি, গ্রিস ও সাইপ্রাস থেকে ৩৫ বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। এর আগে আগস্টে আরও ৪০ বাংলাদেশি ফিরেছিলেন।
কেন এমন হচ্ছে? ইউরোপে যাওয়ার পর কারা ফেরত পাঠানোর ঝুঁকিতে পড়েন? আর দেশে ফিরে তাঁদের সামনে কী সুযোগ থাকে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এই প্রতিবেদন।
১. বৈধ কাগজপত্র না থাকলে কী হয়?
ইউরোপের কোনো দেশে প্রবেশ করলেই সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের অধিকার পাওয়া যায় না। দেশটিতে থাকার জন্য বৈধ ভিসা, বসবাসের অনুমতি কিংবা প্রযোজ্য অন্য কোনো আইনি ভিত্তি থাকতে হয়।
কেউ অনুমোদিত সময়ের বেশি অবস্থান করলে, ভিসা বা বসবাসের অনুমতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও থেকে গেলে কিংবা প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করলে তিনি অনিয়মিত অভিবাসী হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন।
তবে সবাই অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে ইউরোপে প্রবেশ করেন, বিষয়টি এমন নয়। কেউ বৈধ ভিসায় যাওয়ার পর মেয়াদ শেষ হলেও থেকে যেতে পারেন। আবার কারও আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন ও ব্যক্তির পরিস্থিতি বিবেচনা করে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
২. ইউরোপ কেন বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠাচ্ছে?
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতিতে যেসব বিদেশি নাগরিকের কোনো সদস্যরাষ্ট্রে থাকার বৈধ অধিকার নেই, তাঁদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা রয়েছে। তবে সাধারণভাবে এ প্রক্রিয়ায় আইনি সিদ্ধান্ত, পরিচয় যাচাই এবং প্রযোজ্য প্রশাসনিক ও বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।
বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০১৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর অনিয়মিতভাবে অবস্থানরত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত ও দেশে ফেরানোর বিষয়ে একটি স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরস (এসওপি) চুক্তি করে। এর আওতায় বাংলাদেশি নাগরিকত্ব যাচাই এবং প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।
অর্থাৎ, ইউরোপ থেকে বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানো কেবল সাম্প্রতিক কোনো সিদ্ধান্তের ফল নয়; এর পেছনে দীর্ঘদিনের আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া রয়েছে।
৩. ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে যাওয়া কেন ঝুঁকিপূর্ণ?
বাংলাদেশিদের একটি অংশ দালাল বা মানবপাচারকারীদের প্রলোভনে পড়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করেন। এ পথে নৌকাডুবি, প্রাণহানি, অপহরণ, নির্যাতন এবং অর্থ আত্মসাতের মতো ঝুঁকি রয়েছে।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের বরাত দিয়ে দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছে, ২০২৫ সালে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ২০ হাজার ২৫৯ বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছিলেন। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ৪ হাজার ২৪৯ বাংলাদেশি এ পথে ইতালিতে এবং ৩ হাজার ৬০৮ জন লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে গ্রিসে পৌঁছেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এই পরিসংখ্যান দেখায়, বিপজ্জনক সমুদ্রপথে ইউরোপে প্রবেশের প্রবণতা এখনো রয়েছে। তবে ইউরোপে পৌঁছানো ব্যক্তিদের সবাই যে পরে ফেরত পাঠানো হন, এমন নয়।
৪. ইউরোপের ফেরত পাঠানোর নীতি কি আরও কঠোর হচ্ছে?
হ্যাঁ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন অনিয়মিত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছে।
১ অক্টোবর ২০২৬ ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাউন্সিল এমন নতুন নিয়মে চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়, যার লক্ষ্য বৈধভাবে থাকার অধিকার নেই—এমন ব্যক্তিদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করা। এতে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্তের স্বীকৃতি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সহযোগিতার বাধ্যবাধকতা এবং নিরাপত্তাঝুঁকি থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যবস্থার বিধান রয়েছে। তবে নিয়মগুলোর বিভিন্ন অংশ কার্যকর হওয়ার সময় এক নয়।
এ নীতির অর্থ এই নয় যে ইউরোপে বসবাসরত সব বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হবে। যাঁদের বৈধভাবে থাকার অনুমতি রয়েছে, তাঁদের পরিস্থিতি আলাদা। আশ্রয়প্রার্থী বা বিশেষ সুরক্ষার আবেদনকারীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য আইন ও ব্যক্তিগত পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হয়।
৫. দেশে ফেরার পর কী সহায়তা পান বাংলাদেশিরা?
দেশে ফেরত আসা ব্যক্তিদের পুনর্বাসন ও নতুন করে জীবিকা গড়ে তুলতে সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে।
২৩ অক্টোবর দেশে ফেরা ৩৫ বাংলাদেশিকে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম বিমানবন্দরে জরুরি সহায়তা, কাউন্সেলিং এবং বাড়ি পৌঁছানোর জন্য আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ব্র্যাকের যৌথ অর্থায়নে পরিচালিত ‘প্রত্যাশা–২’ প্রকল্পের আওতায় পরবর্তী সময়ে তাঁদের কাউন্সেলিং, প্রশিক্ষণ ও অর্থনৈতিক সহায়তা দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
তবে এসব সহায়তা পাওয়ার অর্থ এই নয় যে দেশে ফেরার পর সবার কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়ে যায়। দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন, উপযুক্ত কাজের সুযোগ এবং আর্থিক পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ।
৬. দালালের মাধ্যমে ইউরোপে যাওয়ার আগে কী জানা জরুরি?
বিদেশে যাওয়ার আগে কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন:
- ভিসা ও কাজের অনুমতি বৈধ কি না, তা যাচাই করা।
- চাকরির চুক্তি, বেতন, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা এবং নিয়োগদাতার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া।
- দালালের কথায় বিপুল টাকা দেওয়া বা ঋণ করে অনিশ্চিত পথে যাত্রা না করা।
- সমুদ্রপথে অনিয়মিতভাবে প্রবেশের চেষ্টা থেকে বিরত থাকা।
- বিদেশে বিপদে পড়লে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেটের সহায়তা নেওয়া।
বৈধ পথে বিদেশে যাওয়া মানেই সব সমস্যা থেকে মুক্ত থাকা নয়। তবে যাচাই করা চাকরি, সঠিক কাগজপত্র ও নির্ভরযোগ্য অভিবাসন প্রক্রিয়া প্রতারণা এবং ফেরত পাঠানোর ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
শেষ কথা
ইউরোপ থেকে বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোর পেছনে মূল কারণ হলো বৈধভাবে অবস্থানের অনুমতি না থাকা এবং সংশ্লিষ্ট দেশের অভিবাসন আইনের প্রয়োগ। এর সঙ্গে অনিয়মিত পথে অভিবাসন, দালালের প্রতারণা ও ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার বিষয়ও জড়িত।
তবে প্রত্যেকের পরিস্থিতি এক নয়। কেউ অনিয়মিতভাবে প্রবেশ করেছেন, কেউ ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকে গেছেন, আবার কেউ আশ্রয়ের আবেদন করে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হয়েছেন। তাই কোনো ব্যক্তিকে ফেরত পাঠানোর কারণ নির্ধারণে তাঁর নিজস্ব পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট দেশের আইনি সিদ্ধান্ত বিবেচনা করা জরুরি।
বিদেশে যাওয়ার আগে বৈধ পথ নিশ্চিত করা এবং দেশে ফেরার পর পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়ানো—এই দুই ক্ষেত্রেই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, দৈনিক মানবকণ্ঠ। তিনি সমসাময়িক বিষয়, আন্তর্জাতিক সংবাদ, অনুবাদ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখা নিয়ে কাজ করেন।




Comments