২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো অতীতের অন্যায়-অবিচারের বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা। একদিকে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে সংঘটিত নির্যাতন ও নিপীড়নের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি রয়েছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের চক্র এড়িয়ে দেশের স্থিতিশীলতা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার করাও জরুরি। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।
পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের এক মতামতধর্মী নিবন্ধে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন, সংস্কার, জবাবদিহি এবং পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে।
নিবন্ধে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়া দেশগুলোর সামনে সাধারণত দুটি পথ থাকে। একটি হলো অতীতের অপরাধের বিচার ও দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা। অন্যটি হলো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে অতীতের বিরোধ পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়া। প্রথম পথ বেছে নিলে প্রতিশোধের রাজনীতিতে আটকে পড়ার ঝুঁকি থাকে। আর দ্বিতীয় পথটি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
সংস্কার ও জবাবদিহির প্রশ্ন
নিবন্ধে ২০২৪ সালের আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরা হয়েছে—দেশটি কি ব্যক্তি-নির্ভর শাসনব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এমন গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারবে, যা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য ও বৈধ বলে বিবেচিত হবে?
শেখ হাসিনার শাসনামলে বিরোধী রাজনীতিক, গণমাধ্যমকর্মী, বুদ্ধিজীবী ও মানবাধিকারকর্মীদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়নের অভিযোগের প্রসঙ্গও এসেছে নিবন্ধে। লেখকের মতে, এসব ঘটনার সঙ্গে তৎকালীন সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। ফলে অতীতের অপরাধের বিচার এবং রাজনৈতিক অর্থনীতিতে বেসামরিক ও সামরিক আমলাতন্ত্রের প্রভাব কমানো নতুন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব মোকাবিলা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে আনার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে নতুন বিতর্ক
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামের সাম্প্রতিক বক্তব্যও নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ২৮ অক্টোবর গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, বর্তমান সরকারকে দায়মুক্তি দেওয়া হলে দেশে আবারও ফ্যাসিবাদের উত্থানের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। তাঁর ভাষায়, আবারও এক হাজার ৪০০ প্রাণের বিনিময়ে কোনো ফ্যাসিবাদী সরকারকে উৎখাত করতে চান না তাঁরা।
নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, বিচার বিভাগ এখনো ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার সংস্কার হয়নি এবং দেশে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে। বিএনপির আশ্রয়-প্রশ্রয় পাওয়া ক্যাডাররা ব্যক্তিগত বিরোধে নিজেদের দলের নেতাকর্মীদেরও হত্যা করছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এ ছাড়া অস্ত্রের বিস্তার, মাদক ব্যবসা এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ তুলে বাংলাদেশকে ‘মাফিয়া রাষ্ট্র’ বলে আখ্যা দেন এনসিপি আহ্বায়ক। তবে এসব বক্তব্য তাঁর রাজনৈতিক অভিযোগ ও মূল্যায়ন হিসেবে নিবন্ধে তুলে ধরা হয়েছে।
লেখকের মতে, নাহিদ ইসলামের অভিযোগগুলোর সবকিছুকে রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। বরং এসব বক্তব্য গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার কতটা এগিয়েছে, তা নিয়ে তৈরি হওয়া উদ্বেগের প্রতিফলন।
পাকিস্তান ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে পাকিস্তান ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি তুলে ধরেছে নিবন্ধটি।
লেখকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনের একটি অংশ পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু করতে আগ্রহী। ২০২৪ সালের আগস্টের পর পাকিস্তানও বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক, প্রতিরক্ষা ও শিক্ষাসংক্রান্ত যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ের সফর ও যোগাযোগও বেড়েছে।
তবে শেখ হাসিনার শাসনামলের উত্তরাধিকার এবং আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যগত ভারতঘনিষ্ঠ অবস্থান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে প্রভাব ফেলছে বলে মনে করেন লেখক। তাঁর মতে, রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও আমলাতন্ত্রের মধ্যে দীর্ঘদিনের ভারতঘনিষ্ঠ অবস্থান পরিবর্তন করাও সহজ নয়। এ কারণে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার সতর্ক অবস্থান নিয়েছে বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের স্থলসীমান্তের বড় অংশ ভারতের সঙ্গে এবং দেশের প্রধান নদীগুলোর অনেকগুলোর উজানেও ভারতের অবস্থান। ফলে সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোতে দুই দেশের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।
নিবন্ধে বলা হয়েছে, ভারতকে সঙ্গে নিয়ে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি চীন, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বিস্তৃত করার চেষ্টা করছে ঢাকা। তবে বৈদেশিক বাণিজ্য, পানির সরবরাহ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাইরের ওপর নির্ভরশীলতা বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ও সহায়তানীতির পরিবর্তন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে বলে নিবন্ধে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, প্রতিষ্ঠান সংস্কার
লেখকের বিশ্লেষণে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এড়িয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করে তোলা। একই সঙ্গে অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের বিচার নিশ্চিত করাও জরুরি।
নিবন্ধে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের শাসনামলের উত্তরাধিকার মোকাবিলা, রাজনৈতিক বিভাজন কমানো এবং বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসনের সংস্কার একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। শুধু সরকার পরিবর্তন করলেই গণতান্ত্রিক রূপান্তর সম্পন্ন হয় না; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, জাপান, চীন, ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা এবং দেশের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক সংস্কার এগিয়ে নেওয়াই তারেক রহমান সরকারের সামনে বড় পরীক্ষা। অতীতের অপরাধের জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রতিষ্ঠান সংস্কারের মধ্যে সমন্বয় করতে পারলেই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা নতুন ভিত্তি পেতে পারে।
সূত্র: দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের মতামতধর্মী নিবন্ধ অবলম্বনে।




Comments