চট্টগ্রাম নগরের সড়ক প্রায় ৪০ বছর আগের, কিন্তু গাড়ি বাড়ছে প্রতিবছর। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাবে নগরে নিবন্ধিত যানবাহন এখন প্রায় ৪ লাখ ৩২ হাজার। প্রতিবছর নতুন নিবন্ধন হচ্ছে প্রায় ২০ হাজার, আনফিট ঘোষণায় বাদ পড়ছে মাত্র ৮০০। বাদ পড়া গাড়িও চলছে প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করে। সঙ্গে আছে বন্দরের পণ্যবাহী ট্রাক ও লরির চাপ, যার একটি অংশ নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও দিনে নগরে ঢোকে।
নগর-পরিকল্পনাবিদদের ভাষ্য, নগরের গড় গতি ঘণ্টায় প্রায় ৫ কিলোমিটারে নেমে আসছে। যা মানুষের হাঁটার গতির সমান। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও পুলিশ অভিযানেও মিলছে না যানজট থেকে মুক্তি।
নিত্যদিনের ভোগান্তি
সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নগরের নানা মোড়ে যানজট এখন নগরবাসীর নিত্যদিনের ভোগান্তি। কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা হাসপাতালে যেতে দীর্ঘ সময় আটকে থাকতে হচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টা, বাড়ছে জ্বালানি খরচ। জরুরি প্রয়োজনে বের হয়েও অনেকে সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না।
নগরবাসীর আশঙ্কা, যানবাহনের চাপ আরও বাড়লে গণপরিবহনে চলাচল তো দূরের কথা, নগরে স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলাও কঠিন হয়ে পড়বে।
সড়কে চলছে ‘আনফিট’ বাহনও
বিআরটিএর চট্টগ্রাম মেট্রো-১ ও মেট্রো-২ সার্কেলের তথ্য অনুযায়ী, দুই সার্কেলে নিবন্ধিত যানবাহন এখন প্রায় ৪ লাখ ৩২ হাজার। প্রতিবছর নতুন নিবন্ধন হয় প্রায় ২০ হাজার, আনফিট ঘোষণা করা হয় মাত্র প্রায় ৮০০টি। অর্থাৎ বছরে নিট যানবাহন বাড়ছে প্রায় ১৯ হাজার ২০০টি।
এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ১০ বছরে নতুন যুক্ত হবে প্রায় ২ লাখ, আর আনফিট হয়ে বাদ পড়বে প্রায় ৮ হাজার। তখন চট্টগ্রামে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৬ লাখে পৌঁছাতে পারে। অথচ প্রায় ৪০ বছর আগে তৈরি সড়কেই এত গাড়ি চলছে, আর সড়ক বাড়ানোর বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেই।
আনফিট ঘোষণার পরও এসব যানবাহনের বড় অংশ সড়কে চলছে বলে অভিযোগ আছে। বিভিন্ন শ্রমিক-মালিক সমিতি বা সংগঠনের প্রভাব খাটিয়ে এবং ট্রাফিক পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ করে গাড়িগুলো চলাচল করে। ফলে কাগজে-কলমে গাড়ি বাদ পড়লেও বাস্তবে সড়কের চাপ কমছে না, উল্টো প্রতিবছর বাড়ছে।
বন্দরের গাড়ির বাড়তি বোঝা
নিবন্ধিত গাড়ির পাশাপাশি দেশের নানা অঞ্চল থেকে পণ্য নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসা গাড়িও নগরের সড়কে চাপ তৈরি করছে। বন্দরকেন্দ্রিক পণ্য পরিবহনে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, লরি ও প্রাইম মুভার চলাচল করে। এসব গাড়ির একটি অংশ নগরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও প্রবেশপথ ব্যবহার করে।
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পণ্যবাহী গাড়ি বন্দরে আসে, আবার বন্দর থেকে পণ্য নিয়ে বিভিন্ন গন্তব্যে যায়। বন্দরের সঙ্গে যুক্ত অফডক, শিল্পকারখানা ও পণ্য পরিবহনকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানেও গাড়ির নিয়মিত যাতায়াত আছে।
তাই মহানগরে নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা দিয়ে প্রতিদিনের মোট যানবাহনের চাপ বোঝা যায় না। স্থানীয় গাড়ির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পণ্যবাহী গাড়ির চাপ। বন্দরমুখী গাড়ির ভিড়, গেটের সামনে অপেক্ষমাণ যানবাহন এবং পণ্য পরিবহনের সময়সূচি ঠিকমতো ব্যবস্থাপনা না হলে যানজটের প্রভাব আশপাশের সড়কেও ছড়িয়ে পড়ে।
নিষেধাজ্ঞায় ‘বুড়ো আঙুল’, দিনেও ঢুকছে ভারী গাড়ি
নগরে যানজটের অন্যতম কারণ দিনের বেলায় পণ্যবাহী ভারী গাড়ির চলাচল। ট্রাফিক পুলিশের নির্ধারিত সময় ও বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও নগরের নানা সড়কে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও অন্যান্য পণ্যবাহী গাড়ি চলাচলের অভিযোগ রয়েছে। বন্দরমুখী সড়ক ও নগরের প্রবেশপথে এসব গাড়ির চাপ বাড়লে অন্য যানবাহনের চলাচলও ব্যাহত হয়।
সময় ও সড়কভিত্তিক বিধিনিষেধ কার্যকর থাকলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ কতটা হচ্ছে, তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। কোন সড়কে কোন শ্রেণির গাড়ি কখন চলতে পারবে, নিষেধাজ্ঞা ভাঙলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং বন্দরকেন্দ্রিক গাড়ির জন্য কোন কোন সড়কে বিশেষ অনুমতি আছে—এসব নিয়ে নেই স্পষ্ট নির্দেশনা।
সড়কে যানজটের অন্যতম কারণ থ্রি-হুইলারের আধিক্য—এমন দাবি চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূইয়ার। তিনি বলেন, ‘প্রয়োজনীয় সংখ্যক মিনিবাস চালু হলে কম জায়গায় বেশি যাত্রী পরিবহন সম্ভব হবে। তাই সড়ক থেকে থ্রি-হুইলার কমানোর প্রস্তাব বিআরটিএকে দেওয়া হয়েছে এবং তারা সম্মতি জানিয়েছে।’
‘একই সঙ্গে ফুটপাত দখলমুক্ত করা এবং অনিবন্ধিত ও কাগজপত্রহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে।’ যোগ করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।
কবির ভুইয়া বলেন, ‘সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত নগরীর ভেতর দিয়ে দূরপাল্লার বাস ও পণ্যবাহী যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আছে। তবে বন্দরমুখী যানকে পোর্ট কানেক্টিং রোড ব্যবহার করতে হয়। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে দিনের বেলায় কোনো যান নগরে ঢুকলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
যানজটের চেনা ফাঁদ
নগরের অক্সিজেন, এ কে খান, অলংকার মোড়, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, জিইসি মোড়, ২ নম্বর গেট, আগ্রাবাদ, দেওয়ানহাট ও বারিক বিল্ডিং এলাকায় যানজট নিয়মিত। বন্দরসংলগ্ন সড়কগুলোর অবস্থাও একই। এসব এলাকার কোনোটি নগরের প্রবেশপথ, কোনোটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র, কোনোটি আবার বন্দর ও আঞ্চলিক সড়কের সংযোগস্থল।
অক্সিজেন ও এ কে খান মোড় দিয়ে উত্তর চট্টগ্রাম ও আশপাশের এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যক যানবাহন নগরে ঢোকে।
অন্যদিকে বন্দরকেন্দ্রিক ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের চলাচলে পোর্ট কানেক্টিং সড়ক, অলংকার মোড়, দেওয়ানহাট ও বারিক বিল্ডিং এলাকায় চাপ বাড়ে।
এসব সড়কে পণ্যবাহী গাড়ির সারি তৈরি হলে যাত্রীবাহী বাস, অটোরিকশা, ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলও আটকে যায়।
সড়কে অবৈধ পার্কিং, নির্ধারিত স্থান ছাড়া যাত্রী ওঠানামা, ফুটপাত দখল ও মোড়ের মুখে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখার প্রবণতাও যানজট বাড়ায়। এতে সড়কের কার্যকর অংশ কমে যায়। একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে গাড়ি আটকে গেলে তার প্রভাব আশপাশের সড়কেও পড়ে।
অভিযান চলছে, তবু মুক্তি নেই
যানজট কমাতে চসিক, সিডিএ ও সিএমপির ট্রাফিক বিভাগ বিভিন্ন সময়ে অভিযান, সড়ক উন্নয়ন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করা, অবৈধ পার্কিং নিয়ন্ত্রণ এবং যান চলাচলে শৃঙ্খলা ফেরানোর কাজ চলছে। গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগও আছে।
তবু নগরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ভোগান্তি পুরোপুরি কমছে না। কোনো এলাকায় অভিযান চালিয়ে সড়ক দখলমুক্ত করা হলেও পরে আবার দখল ফিরে আসার অভিযোগ আছে। আবার উন্নয়নকাজের সময় বিকল্প চলাচলের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকলে যানবাহনের চাপ আরও বেড়ে যায়।
গড় গতি ঘণ্টায় ৫ কিলোমিটার
নগর-পরিকল্পনাবিদ আশিক ইমরান বলেন, ‘মাস্টারপ্ল্যান ও নির্ধারিত অ্যালাইনমেন্ট অনুযায়ী নগরের প্রধান সড়কগুলোর প্রয়োজনীয় প্রশস্ততা নিশ্চিত করা জরুরি। অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে নগরের চলাচলের গতি অনেক কমে এসেছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় গড় গতি ঘণ্টায় প্রায় ৫ কিলোমিটারে নেমে আসার তথ্য উঠে এসেছে।’
পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘শুধু সড়ক সম্প্রসারণ বা নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এর সঙ্গে প্রয়োজন নিয়মিত ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, ভারী গাড়ির প্রবেশ ও চলাচলের সময়সীমা কার্যকর করা, সড়কে পার্কিং বন্ধ করা এবং বন্দরকেন্দ্রিক যানবাহনের জন্য পরিকল্পিত অপেক্ষমাণ স্থান নিশ্চিত করা।’
চসিকের সচিব আশরাফুল আমিন বলেন, ‘যানজট কমাতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে অবৈধ দখল, ফুটপাত দখল, অনিয়ন্ত্রিত পার্কিং ও সড়কে নির্মাণসামগ্রী রাখার বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। গত মাস থেকে টাইগারপাস, মাদারবাড়ি, আগ্রাবাদ, লালখান বাজার, পাঁচলাইশ ও চকবাজার নতুন ব্রিজ এলাকায় ১০টির বেশি অভিযান হয়েছে। ফুটপাত দখলমুক্ত ও হকার ব্যবস্থাপনায় চালানো হয়েছে আরও ১৫টি অভিযান।’
তিনি জানান, গত এক বছরে ২৬৭ কিলোমিটার সড়কের উন্নয়ন হয়েছে। ভবিষ্যতে সড়ক সম্প্রসারণে সার্ভে চলছে। আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ‘স্মার্ট ট্রাফিক সিস্টেম’ প্রকল্পের প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই ও উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরির কাজ চলছে। যানজট কমাতে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় উড়ালসড়ক, এলিভেটেড সড়ক ও রেললাইনের ওপর ওভারপাস নির্মাণের পরিকল্পনাও আছে।
‘সড়ক, ড্রেনেজ, ফুটপাত ও মোড় উন্নয়নের কাজ চলছে। অক্সিজেন-হাটহাজারী সড়কের পাশে বাস টার্মিনালের কাজ শেষ হয়েছে। অক্সিজেন, বহদ্দারহাট, ইস্পাহানি ও বন্দর এলাকায় গণপরিবহন, বাসস্টপ, শ্রমিক পরিবহন ও ভারী যানবাহন ব্যবস্থাপনায় পৃথক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’ বলেন তিনি।
ডিআর




Comments