প্রফেসর ড. এ. এইচ. এম. ইয়াহইয়া রহমান
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও ইসলামী জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে যেসব শিক্ষক তাঁদের মেধা, অধ্যবসায়, গবেষণামনস্কতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে স্বতন্ত্র পরিচয় নির্মাণ করেছেন, প্রফেসর ড. এ. এইচ. এম. ইয়াহইয়া রহমান তাঁদের অন্যতম। তাঁর জীবন ছিল ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসা শিক্ষার সঙ্গে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার সমন্বয়ের এক উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।
তিনি কেবল শ্রেণিকক্ষের শিক্ষকই ছিলেন না; বরং একাধারে ছিলেন কুরআন ও ইসলামিক স্টাডিজের গবেষক, আরবি ভাষা ও সাহিত্যের অনুরাগী, শিক্ষাপ্রশাসক, ধর্মীয় আলোচক এবং সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে নিবেদিতপ্রাণ এক ব্যক্তিত্ব।
জন্ম, পরিবার ও শৈশব
প্রফেসর ড. এ. এইচ. এম. ইয়াহইয়া রহমান ১৯৪৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে খুলনা জেলার কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের সুন্দরবনসংলগ্ন গোলখালী গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন মরহুম হাফেজ সুলতান উদ্দিন সরদার এবং মাতা মরহুমা আমিনা সুলতানা। সাত সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ পুত্র। তাঁর শৈশব ও বেড়ে ওঠা সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার কাশিমাড়ী গ্রামে।
গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা ইয়াহইয়া রহমানের মধ্যে শৈশব থেকেই জ্ঞানার্জনের প্রতি গভীর আগ্রহ, অধ্যবসায় ও ধর্মীয় অনুরাগের পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা নিজ গ্রামেই। পরবর্তী সময়ে উচ্চতর শিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করেন।
শিক্ষাজীবন: মাদ্রাসা ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়
তাঁর শিক্ষাজীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো মাদ্রাসা শিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের উচ্চশিক্ষা গ্রহণ। এ ক্ষেত্রে তিনি দ্বিমুখী শিক্ষাধারার সমন্বয়ের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
তাঁর শিক্ষাজীবনের উল্লেখযোগ্য পর্যায়গুলো নিম্নরূপ:
-
১৯৬১: বন্দরকাটি আলিয়া মাদ্রাসা থেকে দাখিল
-
১৯৬৫: আগরদাঁড়ী আমিনিয়া কামিল মাদ্রাসা থেকে আলিম
-
১৯৬৭: একই প্রতিষ্ঠান থেকে ফাজিল
-
১৯৬৯: শর্ষিনা দারুসসুন্নাত কামিল মাদ্রাসা থেকে হাদিসে কামিল (প্রথম শ্রেণিতে ষষ্ঠ স্থান)
-
১৯৭১: সরকারি নাজিমউদ্দিন কলেজ, মাদারীপুর থেকে এইচএসসি (প্রথম শ্রেণি)
-
১৯৭২: শর্ষিনা মাদ্রাসা থেকে ফিকহে কামিল (প্রথম শ্রেণিতে চতুর্থ স্থান)
-
পরবর্তী সময়ে সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা, ঢাকা থেকে তাফসিরে কামিল
-
১৯৭৪: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগ থেকে স্নাতক (সম্মান) (প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় স্থান)
-
১৯৭৫: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর (প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান)
-
১৯৭৬: ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ থেকে দ্বিতীয় স্নাতকোত্তর (প্রথম শ্রেণিতে পঞ্চম স্থান)
-
১৯৮২: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমফিল
-
১৯৮৪: কিং সউদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিপ্লোমা ইন অ্যারাবিক (প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান)
-
১৯৯০: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন
আলিম পরীক্ষায় মাদ্রাসা বোর্ডে দ্বাদশ স্থান অর্জন, কামিলের একাধিক বিভাগে কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি বিষয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান লাভ তাঁর অসাধারণ মেধা ও অধ্যবসায়ের পরিচয় বহন করে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, তিনি হাদিস, ফিকহ ও তাফসির—এই তিনটি বিষয়ে কামিল ডিগ্রি অর্জন করে 'কামিল ট্রিপল' সম্পন্ন করেন। এর ফলে ইসলামী জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি সুদৃঢ় হয়।
১৯৮২ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ এছহাকের তত্ত্বাবধানে এমফিল সম্পন্ন করেন। অতঃপর ১৯৯০ সালে অধ্যাপক ড. মুহাম্মাদ মুস্তাফিজুর রহমানের তত্ত্বাবধানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।
কর্মজীবনের সূচনা ও শিক্ষকতা
ড. ইয়াহইয়া রহমানের কর্মজীবনের সূচনা ঘটে ছাত্রজীবনেই। ১৯৬৯ সালে কামিল পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগেই তিনি মাদারীপুর আহমাদিয়া আলিয়া কামিল মাদ্রাসায় তৃতীয় মুহাদ্দিস হিসেবে যোগদান করেন। সেখানে এক বছর শিক্ষকতা করার পর শর্ষিনা দারুসসুন্নাত কামিল মাদ্রাসায় সিনিয়র মুহাদ্দিস হিসেবে ১৯৭০ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তীকালে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পড়াশোনা সম্পন্ন করে তিনি সরকারি কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন:
-
১৯৭৮ সালে সরকারি কারমাইকেল কলেজ, রংপুরে প্রভাষক হিসেবে যোগদান।
-
১৯৭৯ সালে সরকারি কবি নজরুল কলেজ, ঢাকায় প্রভাষক হিসেবে যোগদান।
-
১৯৮১ সালে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের চাকরি ছেড়ে সৌদি আরব গমন।
তাঁর শিক্ষকতাজীবনের এই পর্যায়ে মাদ্রাসা ও সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—উভয় ধারায়ই অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়।
সৌদি আরবে কর্মজীবন ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা
১৯৮১ সালে তিনি সৌদি আরব সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে আরবি ভাষা বিশেষজ্ঞ (Arabic Expert) হিসেবে রিয়াদে যোগদান করেন। সেখানে তিনি প্রায় আট বছর কর্মরত ছিলেন।
এ সময় তিনি পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আরবি ভাষা ও ইসলামী জ্ঞানচর্চায় নিবিষ্ট থাকেন। সৌদি আরবে অবস্থানকালে ১৯৮৪ সালে কিং সউদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবি ভাষায় ডিপ্লোমা অর্জন করেন।
প্রবাসে অবস্থানকালেও তিনি প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে নিয়মিত কুরআনের তাফসির ও ধর্মীয় আলোচনা পরিচালনা করতেন। প্রবাসী বাংলাদেশিদের নৈতিক উন্নয়ন, ধর্মীয় সচেতনতা এবং সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠায়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
১৯৮৯ সালে বিদেশের নিশ্চিত ও লোভনীয় কর্মজীবন ছেড়ে দেশে ফিরে আসা তাঁর গভীর দেশপ্রেম ও দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সেবা দেওয়ার আকাঙ্ক্ষার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান ও প্রাতিষ্ঠানিক অবদান
১৯৯১ সালে তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়ার আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে যোগদান করেন। এখানেই তাঁর শিক্ষকতা, গবেষণা ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
১. আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সভাপতি
২. দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সভাপতি
৩. থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদের ডিন
৪. বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর
৫. শহীদ জিয়াউর রহমান হলের প্রভোস্ট
৬. বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি
৭. শিক্ষক সংগঠন 'গ্রিন ফোরাম'-এর একাধিক মেয়াদের সভাপতি
৮. বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্য
৯. ২০০১ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত সিন্ডিকেট সদস্য
১০. ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চের (IIER) পরিচালক
এ ছাড়া তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
বিভাগীয় নেতৃত্ব, অনুষদ পরিচালনা, আবাসিক হলের প্রশাসন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণী কার্যক্রমে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি উচ্চশিক্ষা প্রশাসনে প্রাজ্ঞতার পরিচয় দেন।
গবেষণা ও জ্ঞানচর্চায় অবদান
ড. ইয়াহইয়া রহমানের গবেষণার ক্ষেত্র ছিল বহুমাত্রিক। আরবি ভাষা ও সাহিত্য, কুরআন ও তাফসির, ইসলামী শিক্ষা, মুসলিম সভ্যতা, হাদিসচর্চা এবং সমকালীন সামাজিক সমস্যা ছিল তাঁর গবেষণার উল্লেখযোগ্য বিষয়।
তাঁর প্রকাশিত গবেষণাপত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো:
১. বাংলাদেশে ইসলাম কখন এসেছে
২. বাংলাদেশে ইসলামী শিক্ষা: সমস্যা ও তার সমাধান
৩. মুসলিম বিশ্ব: অধঃপতনের কারণ ও তার প্রতিকার
৪. অমুসলিমদের কুরআন চর্চা
৫. আল্লামা নিয়ায মাখদুম: বাংলাদেশে হাদিস শিক্ষাদানে তাঁর অবদান
৬. বিশ্বসভ্যতায় বিস্ময়কর দুজন মুসলিম মনীষীর অবদান
৭. সামাজিক অবক্ষয় ও মাদকরোধে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
৮. মহানবী (সা.)-এর আদর্শই সকল সমস্যার একমাত্র সমাধান
৯. সূরা ফাতিহার তাফসির: তুলনামূলক আলোচনা
১০. জুমার খুতবা
১১. Al-Qur'an: An Unparalleled Constitution
১২. Satire in Arabic Poetry and its Influence in the Society
১৩. Women in Different Religions and Nations
১৪. Women in Arabic Poetry
১৫. Ibn Al-Rumi and His Contribution to Arabic Poetry
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, বাংলাদেশে ইসলামের আগমনবিষয়ক তাঁর গবেষণা ভারতের প্রসিদ্ধ সাময়িকী 'আল-বা'ছ আল-ইসলামী'তে দুই পর্বে প্রকাশিত হয়। এ গবেষণার বিষয়বস্তু বাংলাদেশের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় এর বিশেষ ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে।
গবেষণাকর্মের বিষয়বৈচিত্র্য থেকে প্রতীয়মান হয় যে তিনি কেবল ধর্মতাত্ত্বিক আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বরং ইতিহাস, সাহিত্য, সমাজ ও সভ্যতার বিভিন্ন বিষয়েও গভীর অনুসন্ধিৎসু ছিলেন।
গ্রন্থ রচনা ও সম্পাদনাকর্ম
ড. ইয়াহইয়া রহমানের প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
-
মাওয়ালী এবং ইসলামী উলুমে তাঁদের অবদান (The Mawali and Their Contribution to Islamic Science)
-
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর জীবনী
এ ছাড়া তিনি 'ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় স্টাডিজ' জার্নালের চারটি খণ্ড সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৯২ ও ২০০৪ সালের সমাবর্তন স্মারক সম্পাদনার সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন।
গবেষক তৈরি ও উচ্চশিক্ষায় অবদান
ড. ইয়াহইয়া রহমানের তত্ত্বাবধানে ১২ জন গবেষক এমফিল এবং ১০ জন গবেষক পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন বলে তথ্য পাওয়া যায়।
তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগত পরীক্ষক, গবেষণা-তত্ত্বাবধায়ক ও বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ইসলামী শিক্ষা ও সমাজসেবায় অবদান
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে ইসলামী শিক্ষা ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কর্মকাণ্ড:
-
ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের বিভিন্ন গবেষণাকর্মে অংশগ্রহণ।
-
ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমিতে দীর্ঘদিন বিশেষ প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন।
-
বাংলাদেশ মসজিদ মিশনের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন।
-
আল-মুনতাদা আল-ইসলামী ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থটের (BIIT) কার্যক্রমে সম্পৃক্ততা।
-
মসজিদ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠায় পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতা।
-
অসচ্ছল ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান।
-
বৃক্ষরোপণ ও সামাজিক অবক্ষয় প্রতিরোধে জনসচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড।
তিনি দীর্ঘদিন রাজারবাগ পুলিশ লাইনস কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, টিকাটুলি মসজিদ এবং কুষ্টিয়ার কোর্টপাড়া জামে মসজিদে জুমার খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ খতিব হিসেবেও তিনি একাধিকবার স্বীকৃতি লাভ করেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিনিধিত্ব
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তিনি শিক্ষা ও ইসলামী জ্ঞানচর্চার বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন:
-
১৯৮৭ সালে রিয়াদে অনুষ্ঠিত তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব।
-
১৯৯৮ সালে উজবেকিস্তানের রাজধানী তাশখন্দে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে অংশগ্রহণ।
-
২০০২ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত 'Quality Assurance in Higher Education in Bangladesh' শীর্ষক আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশগ্রহণ।
-
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিভিন্ন সেমিনার ও গবেষণা সম্মেলনে প্রবন্ধ উপস্থাপন।
শিক্ষাক্ষেত্রে স্বীকৃতি ও সম্মাননা
জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৫ সালে তিনি 'শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক' হিসেবে মনোনীত হন এবং সরকারি বিশেষ পুরস্কার লাভ করেন।
মৃত্যু ও স্মৃতিচারণ
প্রফেসর ড. এ. এইচ. এম. ইয়াহইয়া রহমান ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর ইন্তেকাল করেন। তাঁর ইন্তেকালে দেশের শিক্ষাবিদ, ইসলামী চিন্তাবিদ, গবেষক ও পেশাজীবী মহল গভীর শোক প্রকাশ করে।
২০২৬ সালের ১০ জানুয়ারি ঢাকার উত্তরায় ইলহাম ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষার্থী এবং শুভানুধ্যায়ীরা অংশগ্রহণ করেন।
জীবন ও কর্মের মূল্যায়ন
প্রফেসর ড. ইয়াহইয়া রহমানের জীবন ও কর্ম বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে প্রতিভাত হয়:
-
দ্বিমুখী শিক্ষাধারার সমন্বয়: ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসা শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষায় উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন তাঁকে বহুমুখী জ্ঞানচর্চার সুযোগ করে দেয়।
-
গবেষণামুখী মানসিকতা: কুরআন, হাদিস, আরবি সাহিত্যের পাশাপাশি ইতিহাস, সমাজ ও সভ্যতার সমকালীন সংকট তাঁর গবেষণায় স্থান পেয়েছে।
-
শিক্ষাপ্রশাসনে দক্ষতা: বিভাগীয় সভাপতি, ডিন, প্রক্টর, হল প্রভোস্ট ও সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় কার্যকর ভূমিকা রাখেন।
-
গবেষক তৈরিতে অবদান: ২২ জনেরও বেশি এমফিল ও পিএইচডি গবেষকের দিকনির্দেশনা দিয়ে তিনি উচ্চশিক্ষার পরিসর সমৃদ্ধ করেছেন।
-
সামাজিক দায়বদ্ধতা: খুতবা, ইমাম প্রশিক্ষণ, শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান ও সচেতনতামূলক কাজের মাধ্যমে তিনি নিজেকে একজন সমাজমনস্ক শিক্ষাবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
উপসংহার
একজন শিক্ষকের প্রকৃত সার্থকতা নিহিত থাকে তিনি কতজন শিক্ষার্থীকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে পেরেছেন, গবেষণার কী ধরনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছেন এবং সমাজের জন্য কতটা অবদান রেখে গেছেন।
প্রফেসর ড. এ. এইচ. এম. ইয়াহইয়া রহমান ঐতিহ্যবাহী ইসলামী শিক্ষা ও আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মধ্যে একটি কার্যকর সেতুবন্ধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর শিক্ষা, গবেষণা, প্রশাসনিক প্রজ্ঞা ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ড দেশের ইসলামী উচ্চশিক্ষার অঙ্গনে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
আল্লাহ তাআলা তাঁর নেক আমলগুলো কবুল করুন, ভুলত্রুটি ক্ষমা করে তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন। আমিন।
লেখক: অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
এনআর/এমজেড




Comments