Image description

একসময় যে নদীর বুকে চলত লঞ্চ-নৌকা, যে জলধারা ঘিরে গড়ে উঠেছিল কৃষি, মৎস্য ও স্থানীয় অর্থনীতির সমৃদ্ধ জনপদ, সেই ময়না কাটা নদী এখন অস্তিত্ব সংকটে। দখল, অবৈধ ভরাট, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ ও পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে শিবচর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী এ নদীটি ক্রমেই সংকুচিত হয়ে মরা খালে পরিণত হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীর বিভিন্ন অংশ ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ ও চাষাবাদ করায় হারিয়ে যাচ্ছে এর স্বাভাবিক গতিপথ।

নদীর দুই পাড়ে গড়ে উঠেছে দাদা ভাই উপশহর নামে হাউজিং প্রকল্প, শিশুপার্ক, মডেল মসজিদ, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজসহ বিভিন্ন স্থাপনা। এসব স্থাপনার অবস্থান ও নির্মাণকাজের সঙ্গে নদীর প্রকৃত সীমানা, প্রবাহপথ এবং ভরাটের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। 

তাঁদের দাবি, প্রভাবশালী মহলের দখলদারিত্ব, অপরিকল্পিত নির্মাণ ও বিভিন্ন স্থানে মাটি ভরাটের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিরূপণে নদীর সীমানা ও দখলের বিষয়টি সরেজমিনে তদন্ত করা প্রয়োজন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক বছর আগেও ময়না কাটা নদীতে সারা বছর পানি থাকত। নদীটি ছিল কৃষিকাজ, মাছ ধরা ও নৌ-যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। ময়নাকাটার নীমতলা থেকে মাদারীপুর পর্যন্ত লঞ্চ চলাচল করত। এ ছাড়া মাদবরের চর থেকে পাঁচ্চর হয়ে ময়না কাটা বিল পদ্মা নদী এবং সেখান থেকে আড়িয়াল খাঁ নদের সঙ্গে নৌপথের সংযোগ ছিল। এই নদীপথে স্থানীয় হাটবাজার থেকে ধান, পাট, বাদাম, কলাইসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবহন করা হতো।

কিন্তু সময়ের ব্যবধানে নদীর দুই পাড় দখল, বিভিন্ন স্থানে বাঁধ নির্মাণ, মাটি ভরাট ও অপরিকল্পিত স্থাপনা গড়ে ওঠায় এর প্রশস্ততা ও গভীরতা কমে এসেছে। নদীর অনেক অংশে এখন পানি নেই। কোথাও কোথাও নদীর বুকেই চলছে চাষাবাদ। বর্ষা মৌসুমে সামান্য পানি জমলেও বছরের অধিকাংশ সময় নদীটি প্রায় শুকনো অবস্থায় থাকে। ফলে একসময়ের ব্যস্ত নৌপথটি এখন অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে।

নদীর এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে স্থানীয় কৃষি ও জীবিকায়। কৃষকদের ভাষ্য, আগে নদীর পানি ব্যবহার করে সহজেই জমিতে সেচ দেওয়া যেত। এখন নদীতে পানি না থাকায় গভীর নলকূপের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে সেচের খরচ বাড়ছে, পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকটও তৈরি হচ্ছে।

অন্যদিকে, স্থানীয় জেলেদের জীবিকাতেও নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা। একসময় ময়না কাটা নদীতে দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। নদীতে পানি ও মাছের বিচরণক্ষেত্র কমে যাওয়ায় মাছ ধরার সুযোগও কমেছে। ফলে নদীনির্ভর অনেক জেলে পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, নদীর বিভিন্ন অংশে প্রভাবশালীদের দখলদারিত্ব থাকায় অনেকে প্রতিবাদ করতে সাহস পান না। দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর নজরদারি ও দখলমুক্ত করার উদ্যোগ না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। তাঁদের প্রশ্ন, একটি ঐতিহ্যবাহী নদী ধীরে ধীরে হারিয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ কোথায়?

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, ময়না কাটা নদী শুধু একটি জলধারা নয়; এটি এলাকার কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও নৌ-যোগাযোগের ঐতিহাসিক অংশ। নদীটি পুনরুদ্ধার করা গেলে একদিকে যেমন পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক হবে, অন্যদিকে কৃষি ও মৎস্যসম্পদ বিকাশের পাশাপাশি জলাবদ্ধতা নিরসনেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

তাঁরা দ্রুত নদীটির সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ দখল ও ভরাটের স্থান চিহ্নিতকরণ, দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে খননের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নদীর সঙ্গে সংযুক্ত খাল ও নৌপথের পানিপ্রবাহ সচল রাখার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে শুধু খনন করলেই হবে না; এর প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ, পানিপ্রবাহের উৎস ও সংযোগস্থল সচল রাখা এবং ভবিষ্যতে পুনরায় দখল বন্ধে নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।

এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে শিবচরের ঐতিহ্যবাহী ময়না কাটা নদী একসময় মানচিত্রে নামমাত্র অস্তিত্ব নিয়ে টিকে থাকলেও বাস্তবে হারিয়ে যেতে পারে। তাই নদীটির অতীত ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জলাধারটি সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

বিএইচ