Image description

গত ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক রফতানি করেছে সাড়ে ৪২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। আর চলতি অর্থবছরের রফতানি লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৪৭ বিলিয়ন ডলার। এ বছরের ৯ মাসে পোশাক রফতানির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৪ বিলিয়ন ডলারের, বিপরীতে রফতানি হয়েছে ৩৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। পোশাক রফতানির এই চিত্রগুলো খুবই স্বস্তিদায়ক। 

বিশ্ববাজারে পোশাক রফতানিতে চীন সবার ওপরে থাকলেও দেশটি মূলত উচ্চমূল্যের পোশাক রফতানি করে বেশি। কম দামি পোশাক রফতানিকারক দেশ ধরলে বাংলাদেশই সবার ওপরে। যদিও বলা হয় বিশ্ব বাজারে পোশাক রফতানিতে দ্বিতীয়। রফতানিতে প্রথম বা দ্বিতীয়-যে অবস্থানেই থাকুক না কেন, পোশাক শ্রমিকদের মজুরি দেওয়ার ক্ষেত্রে সবার নিচে আছে বাংলাদেশ।

এদিকে দেশের অনেক খাতে ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা হয়, কিন্তু বাস্তবায়ন হয় না। এ পর্যন্ত ৪২টি খাতে ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করা হলেও কোনো খাতেই শতভাগ বাস্তবায়ন হয়নি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্ধারিত মজুরিও অত্যন্ত কম। এখন পর্যন্ত অন্তত ৫৮ শিল্পে ন্যূনতম মজুরি ঘোষণাই করা হয়নি। প্রতি পাঁচ বছরের মধ্যে মজুরি পর্যালোচনার নিয়ম থাকলেও একবারও পর্যালোচনা করা হয়নি ঘোষিত বেশিরভাগ শিল্পে।

ঘোষিত মজুরিও বাস্তবায়ন হয় না সব শিল্পে। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের (ডিআইএফই) সর্বশেষ কমপ্লায়েন্স প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ শতাংশ কারখানায় সরকার ঘোষিত ন্যূনতম মজুরি কাঠামো অনুসরণ করা হয় না। একইসংখ্যক কারখানার শ্রমিকরা নিয়মিত মজুরি পান না। মূলত বড় কারখানার সাব-কন্ট্রাক্টের কাজ হয় এসব কারখানায়। 

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রেড ইউনিয়ন নেই ৮০ শতাংশ কারখানায়। পার্টিসিপেটরি কমিটি নেই ৬৫ শতাংশ কারখানায়। ৯ শতাংশ কারখানায় শ্রমিকরা কাজ করেও ওভারটাইম পান না। এমনকি মাতৃত্বকালীন ছুটি দেওয়া হয় না ৩৫ শতাংশ কারখানায়। পরিদর্শনে এ রকম ২৬টি সূচকের সবক’টিতেই দুর্বলতা পাওয়া গেছে। তবে শিশুশ্রম প্রশ্নে আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি হয়েছে। মাত্র ১ শতাংশ কারখানায় শিশুশ্রমের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।

শ্রমিক নেতারা বলছেন, মালিকরা শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির ব্যাপারে সবসময়ই উদাসীন। আর সরকারও শ্রমিক স্বার্থ না দেখে সবসময় মালিক স্বার্থকেই প্রাধান্য দেয়। এ জন্য দেশের প্রায় ৬ কোটি শ্রমিক কোনো না কোনোভাবে বঞ্চিত হচ্ছে তাদের অধিকার থেকে।

এ বিষয়ে শ্রমিক নেতা তৌহিদুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, এটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক বিষয়- যে দেশ রফতানিতে শীর্ষে রয়েছে সে দেশের শ্রমিক পাচ্ছে সবচেয়ে কম মজুরি। অন্যান্য দেশের কথা বাদই দিলাম, সামরিক জান্তা দ্বারা পরিচালিত প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের শ্রমিকরাও আমাদের দেশের শ্রমিকদের চেয়ে বেশি মজুরি পায়। এ বছর নতুন মজুরি পাওয়ার কথা গার্মেন্টস শ্রমিকদের। এ জন্য ইতিমধ্যে মজুরি বোর্ড গঠনও করা হয়েছে। তাই মে দিবসের প্রাক্কালে আমি শিল্প মালিক ও সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি-শ্রমিকদের এমন মজুরি আপনারা দেন, যা দিয়ে তারা তিন বেলা ডাল-ভাত খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে। ৬৫ শতাংশ বেসিক বৃদ্ধি করে এবার মজুরি নির্ধারণ করতে হবে।

তিনি বলেন, বিগত কয়েক বছরে দেশে মূল্যস্ফীতি যে হারে বেড়েছে তাতে শ্রমিকদের বেঁচে থাকাই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। শ্রমিক পরিবারে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু মজুরি বৃদ্ধি পায়নি। এ ছাড়া বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ব্যয়, শিক্ষা ব্যয়ও বেড়েছে অস্বাভাবিক। এ অবস্থায় অল্প মজুরি দিয়ে কীভাবে চলবে শ্রমিকের সংসার। তাই মে দিবসে আমাদের দাবি শ্রমিকদের বেঁচে থাকার মতো মজুরি দিন।

আরেক শ্রমিক নেতা সিরাজুল ইসলাম রনি সময়ের আলোকে বলেন, মজুরি বৃদ্ধিতে শিল্প মালিকদের যেমন মুখ্য ভূমিকা রাখতে হবে, তেমনি বিদেশি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানেরও দায় রয়েছে। তাদেরও পোশাকের ক্রয়মূল্য বাড়াতে হবে। পোশাকের ক্রয়মূল্য বাড়ালে শিল্প মালিকেরও বেতন বাড়াতে আগ্রহী হবে। তবে এ ক্ষেত্রে বিদেশি ক্রেতাদের চাওয়া শিল্প মালিকদের আগে এগিয়ে আসতে হবে। মালিকরা কতটা দিচ্ছে, কীভাবে দিচ্ছে সেগুলো দেখার পর ক্রেতারা দাম বাড়াতে চান। এ জন্য এ ক্ষেত্রে সমন্বয়ের দরকার রয়েছে।

মজুরিতে সবার নিচে বাংলাদেশ : সম্প্রতি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) একটি জরিপ করেছে গার্মেন্টস খাতের শ্রমিকদের মজুরি কাঠামো পরিস্থিতি নিয়ে। বিলসের এই গবেষণার একটি অংশে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে গার্মেন্টস শিল্পে বাংলাদেশের প্রতিযোগী অন্যান্য দেশের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি কাঠামো কেমন, তার চিত্র। 

এতে উল্লেখ করা হয়, তুরস্কে গার্মেন্টস খাতে মোট শ্রমিক কাজ করে ৪০ লাখ। দেশটির গার্মেন্টস শ্রমিকরা প্রতি ঘণ্টার হিসাবে মজুরি পায় ১ দশমিক ৪৮ ডলার, আর মাসিক ন্যূনতম মজুরি পায় ৩০৭ ডলার। বাংলাদেশি টাকার অঙ্কে যা দাঁড়ায় ২৯ হাজার ১৬৫ টাকা। দেশটি সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন করে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে। ভিয়েতনামে কাজ করে ২৫ লাখ গার্মেন্টস শ্রমিক। দেশটির শ্রমিকরা মাসিক ন্যূনতম মজুরি পায় ১৬৮ ডলার বা ১৫ হাজার ৯৬০ টাকা। দেশটি ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন করে ২০২২ সালের জুলাইয়ে। ফিলিপাইনে কাজ করে সাড়ে ৫ লাখ গার্মেন্টস শ্রমিক। তাদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ২৪৪ ডলার বা ২৩ হাজার ১৮০ টাকা। দেশটি সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন করেছে ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে। মালয়েশিয়ায় কাজ করে ২ লাখ ৬০ হাজারের মতো গার্মেন্টস শ্রমিক। তারা মাসিক ন্যূনতম মজুরি পায় ২৫০ থেকে ২৭০ ডলার বা ২৩ হাজার ৭৫০ টাকা থেকে ২৫ হাজার ৯৩৫ টাকা। মালয়েশিয়া ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন করে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে।

আরেক প্রতিযোগী দেশ কলম্বিয়ায় কাজ করে ৬ লাখ গার্মেন্টস শ্রমিক। তারা ন্যূনতম মজুরি পায় ১৯৪ ডলার বা ১৮ হাজার ৪৩০ টাকা। দেশটি ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন করে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। ইন্দোনেশিয়ায় কাজ করে ৪২ লাখ গার্মেন্টস শ্রমিক। তারা ন্যূনতম মজুরি পায় ১৩৭ ডলার বা ১৩ হাজার ১৫ টাকা। দেশটি ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন করে ২০২২ সালে। 

প্রতিবেশি দেশ ভারতে গার্মেন্টস শিল্পে কাজ করে সাড়ে ৪ কোটি। তারা ন্যূনতম মজুরি পায় ১২৮ ডলার বা ১২ হাজার ১৬০ টাকা। সেখানে সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন করা হয় ২০২০ থেকে ২২ সালের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রদেশে। চীনে কাজ করে প্রায় দেড় কোটির ওপরে গার্মেন্টস শ্রমিক। তারা ন্যূনতম মজুরি পায় ২৬২ ডলার বা ২৪ হাজার ৮৯০ টাকা। দেশটি বিভিন্ন প্রদেশে ২০২০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন করে।

বিলসের ওই গবেষণার তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে বর্তমানে গার্মেন্টস শিল্পে কাজ করছে ৩২ লাখ শ্রমিক। তারা ন্যূনতম মজুরি পাচ্ছে ৭৫ দশমিক ৫০ ডলার। টাকার অঙ্কে যা দাঁড়ায় ৮ হাজার টাকা (প্রতি ডলার ১০৬ টাকার হিসাবে)। সুতরাং দেখা যাচ্ছে প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম মজুরি পাচ্ছেন বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকরা। এ জন্যই বিলসের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম গড় মজুরি ২০২ ডলার বা ২১ হাজার ৪১৫ টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, দ্রুত নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে আনুষ্ঠানিকভাবে এই মজুরি কাঠামো ঘোষণা দেওয়ারও প্রস্তাব করা হয়েছে বিলসের গবেষণায়। 

পদে পদে বঞ্চিত নারী শ্রমিক : এদিকে কর্মক্ষেত্রে পুরুষ শ্রমিকদের চেয়ে নারী শ্রমিকরা পদে পদে বঞ্চিত হন। নারী শ্রমিকদের সবচেয়ে বড় বঞ্চনা সহ্য করতে হয় বেতনের ক্ষেত্রে। দেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প থেকে শুরু প্রায় সব শিল্প খাতেই পুরুষ শ্রমিকের চেয়ে নারী শ্রমিক কম মজুরি পেয়ে থাকেন। 

গার্মেন্টস খাতে নারী শ্রমিকের মজুরি কম পাওয়ার বিষয়ে শ্রমিক নেতা তৌহিদুর রহমান বলেন, বড় কারখানাগুলোতে বেতন বৈষম্য তেমন একটি না থাকলেও গার্মেন্টসের ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোতে নারী শ্রমিকরা পুরুষ শ্রমিকের চেয়ে ৫০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা পর্যন্ত কম মজুরি পান। শিল্প মালিকরা নারী শ্রমিকদের বেলায় কাজ কম করার অভিযোগ তুলে বেতন কম দেন। এ ছাড়া প্রমোশনের ক্ষেত্রে নারী শ্রমিকরা বঞ্চিত হন। দেখা যাচ্ছে একই সঙ্গে কোনো কারখানায় নারী ও পুরুষ শ্রমিক কাজে যুক্ত হলো-এক বছর বা দুই বছর পর যখন প্রমোশন দেওয়া হয়, তখন দেখা যাচ্ছে পুরুষ শ্রমিক প্রমোশন পাচ্ছে, কিন্তু নারী শ্রমিক পাচ্ছে না। এ ছাড়া কর্মস্থলে নারী শ্রমিককে যৌন হয়রানিসহ অশ্লীল ভাষায় গালাগাল করা হয়। দেখা যাচ্ছে চাকরি হারানোর ভয়ে নারী শ্রমিক এসব সহ্য করছেন। অথচ শ্রম আইনের ৩৩৩ ধারায় পরিষ্কারভাবে বলা আছে- কোনো নারী শ্রমিকের সঙ্গে খারাপ আচরণ ও অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করা যাবে না।’

চা-শ্রমিকরা মজুরি পান ১৭০ টাকা : এই উচ্চমূল্যের বাজারে চা শ্রমিকরা দৈনিক মজুরি পান মাত্র ১৭০ টাকা। তাও দীর্ঘ আন্দোলনের প্রেক্ষিতে গত বছরের আগস্ট মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে চা-বাগান মালিকদের বৈঠকের পর এই মজুরি ঘোষণা করা হয়। অথচ দৈনিক ৩০০ টাকা মজুরির দাবিতে গত বছরের ৯ আগস্ট থেকে কর্মবিরতি শুরু করেন চা-শ্রমিকরা। পরে ১৩ আগস্ট থেকে সারা দেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট শুরু করেন তারা। এর আগ পর্যন্ত দৈনিক মজুরি পেতেন মাত্র ১২০ টাকা।