রংপুর নগরীতে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষকসহ একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। রোববার (২৩ আগস্ট) রাতে জবানবন্দি গ্রহণ শেষে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।
গ্রেপ্তার দুজন হলেন মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯)। রোববার বিকেল ৫টার দিকে তাদের রংপুর মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করা হয়। পরে বিচারক মো. রফিকুল ইসলামের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন তারা।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও কোতয়ালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি জানান, দুই আসামি হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেওয়ায় তাদের আর রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। পরে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।
শনিবার রাত ১১টার দিকে নগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কামাল কাছনা মাছুয়াপাড়া (দাসপাড়া) এলাকার একটি নির্মাণাধীন বাড়ি থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতরা হলেন—রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ভোলা (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৩) ও ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়ম (১২)।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে পাশের ভবনের ওপর দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যায় মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। সেখানে তারা ইয়াবা সেবন করছিল। শব্দ পেয়ে গণপতি ছাদে গিয়ে তাদের সেখানে থাকার কারণ জানতে চাইলে তার গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়।
গণপতির চিৎকার শুনে তার স্ত্রী প্রীতিলতা সিঁড়ি দিয়ে ছাদে উঠলে তাকেও গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। পরে মায়ের চিৎকার শুনে মেয়ে এগিয়ে এলে তাকেও গামছা ও রশি দিয়ে হত্যা করা হয়। সবশেষে ঘুমন্ত শিশু প্রিয়মকে কাপড় ও বালিশ ব্যবহার করে হত্যা করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ জানান, হত্যাকাণ্ডের পর দুই আসামি বাড়ির একটি বাথরুমে গোসল করে। এরপর তারা ডাইনিং টেবিলে বসে খেজুর ও অবশিষ্ট ইয়াবা সেবন করে। পরে রাস্তাঘাট ফাঁকা থাকার সুযোগে কিছু স্বর্ণালংকার নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। এসব স্বর্ণালংকার কাছের একটি মন্দিরের পেছনে পরিত্যক্ত জায়গায় লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। আসামিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সেগুলো উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশের দাবি, ঘটনাটিকে ডাকাতি হিসেবে দেখাতে আসামিরা ইচ্ছাকৃতভাবে ঘরের আসবাব ও অন্যান্য জিনিসপত্র এলোমেলো করে রাখে। পাশাপাশি আঙুলের ছাপ মুছে ফেলতে দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়েছিল।
নিহত চারজনের মুখ ঝলসানো অবস্থায় পাওয়া যায়। মুখমণ্ডলের কাছে তরল পদার্থও পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে সিআইডি। তবে সেখানে কোনো রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
রংপুর সিআইডির পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত) সুমিত চৌধুরী বলেন, বিষয়টি ফরেনসিক পরীক্ষার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। ধারণা করা হচ্ছে, হত্যার আগে বা পরে তাদের মুখে কোনো দাহ্য পদার্থ দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
তবে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস বলেন, মরদেহগুলো পচে যাওয়ার কারণে মুখমণ্ডল এমন মনে হতে পারে। কোনো এসিড দিয়ে ঝলসানোর ঘটনা তিনি পাননি।
রোববার ময়নাতদন্ত শেষে চারজনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে রাতে দখিগঞ্জ শ্মশানে তাদের দাহ করা হয়।
প্রভিডেন্ট ফান্ডের ১৫ লাখ টাকা
নিহত গণপতি চক্রবর্তী প্রায় এক মাস আগে প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে ১৫ লাখ টাকা তুলেছিলেন বলে জানিয়েছেন রংপুর জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ। বাড়ির অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করার জন্য তিনি ওই টাকা তুলেছিলেন বলে জানান তিনি।
তবে টাকা ব্যাংকে রাখা হয়েছিল নাকি বাড়িতে, তা নিশ্চিত নয়। গণপতির বড় ভাই ও মামলার বাদী গোপীনাথ চক্রবর্তীও এ বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন।
এ ঘটনায় রোববার কোতয়ালী থানায় হত্যা মামলা করেন গোপীনাথ চক্রবর্তী। মামলায় কোনো আসামির নাম উল্লেখ করা হয়নি।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নানা আলোচনা ও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে নিহত, আসামি ও তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের পরিচয় এবং কিছু দৃশ্যমান মিল নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তবে এসব আলোচনার সত্যতা যাচাই করে দেখা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এসএস




Comments