ইরানে প্রকাশ্যে হিজাব পরা ছেড়ে দিয়েছেন অনেক নারী। রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরের রাস্তায় মাথায় স্কার্ফ ছাড়াই নারীদের চলাচল এখন আগের তুলনায় বেশি দৃশ্যমান। যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট ও অভ্যন্তরীণ নানা চাপের মধ্যে থাকা ইরান সরকার এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নিতেও যেন কিছুটা দ্বিধায় রয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের সময় সরকারপন্থি জনসভা ও রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমেও হিজাবহীন নারীদের দেখা গেছে। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে হিজাব ছাড়া নারীদের প্রকাশ্যে চলাচলের দৃশ্যও দেখা যাচ্ছে।
ইরানের কট্টরপন্থিরা অবশ্য এ অবস্থার বিরোধিতা করছেন। তারা বাধ্যতামূলক হিজাব আইন আরও কঠোরভাবে কার্যকর করার দাবি জানাচ্ছেন। পোশাকের নিয়ম না মানায় ইতোমধ্যে কিছু ক্যাফে ও রেস্তোরাঁ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
তবে সরকারের জন্য বিষয়টি সহজ নয়। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এক বিষয়, আর বিপুলসংখ্যক নারীকে বাধ্যতামূলকভাবে হিজাব পরাতে আবার রাস্তায় নীতি পুলিশ নামানো আরেক বিষয়। ২০২২ সালের মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর যে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল, নতুন করে তেমন পরিস্থিতি তৈরি হোক—এটি সরকার এড়িয়ে চলতে চাইছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
মাহসা আমিনির পর বদলে যায় পরিস্থিতি
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানে ধীরে ধীরে নারীদের জন্য বাধ্যতামূলক ইসলামি পোশাকের বিধান কার্যকর করা হয়। পরে পোশাকবিধি বাস্তবায়নে ‘গাইডেন্স প্যাট্রোল’ বা নীতি পুলিশকে ব্যবহার করা হয়।
২০২২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ২২ বছর বয়সী কুর্দি-ইরানি নারী মাহসা আমিনিকে ‘সঠিকভাবে হিজাব না পরার’ অভিযোগে আটক করে নীতি পুলিশ। তিন দিন পর পুলিশ হেফাজতে তার মৃত্যু হয়।
তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ স্লোগানে শুরু হওয়া ওই আন্দোলনে বহু মানুষ নিহত ও আটক হন। নারীদের একটি বড় অংশ প্রকাশ্যে হিজাব পরার নিয়ম অমান্য করতে শুরু করেন।
জাতিসংঘের একটি তদন্তে বলা হয়, আমিনির মৃত্যু বেআইনি বলপ্রয়োগের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। ইরানি কর্তৃপক্ষ অবশ্য তার মৃত্যুর কারণ নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছিল।
কঠোর আইন হলেও বাস্তবায়ন থমকে আছে
২০২৪ সালে ইরানে হিজাব আইন লঙ্ঘনের জন্য কঠোর শাস্তি ও নজরদারির বিধান রেখে নতুন আইন অনুমোদন করা হয়। তবে সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপে আইনটির বাস্তবায়ন স্থগিত করা হয়।
এরই মধ্যে হিজাব না পরার প্রবণতা আরও বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন ভিডিওতে তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে মাথায় স্কার্ফ ছাড়া নারীদের চলাচল করতে দেখা যাচ্ছে।
মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, বাধ্যতামূলক হিজাব আইন না মানার অভিযোগে গত ১৯ জুলাই তেহরানে অন্তত সাতটি ক্যাফে ও রেস্তোরাঁ বন্ধ করা হয়েছে। দক্ষিণ খোরাসান প্রদেশেও একই অভিযোগে কয়েকটি ক্যাফে বন্ধের খবর পাওয়া গেছে।
নারীদের বিরুদ্ধে নতুন সংঘাত চায় না সরকার?
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করে মানুষের আচরণ পরিবর্তন করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, আচরণের পরিবর্তন সাংস্কৃতিক ও বিশ্বাসের বিষয়; শক্তি প্রয়োগ করে মানুষের মনে বিশ্বাস তৈরি করা যায় না।
ইরানের সাবেক সংসদ সদস্য গোলামআলী জাফরজাদেহ ইমানাবাদীও সরকারের অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে সরকারের উচিত মূল্যস্ফীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার সমস্যার দিকে বেশি নজর দেওয়া।
অন্যদিকে কট্টরপন্থিরা মনে করছেন, হিজাব আইন কার্যকর না করলে ইরানের ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ হুমকির মুখে পড়বে। তাই তারা সরকারকে আরও কঠোর হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন।
রাস্তায় বদলে যাচ্ছে দৃশ্য
তেহরানের এক ষাটোর্ধ্ব নারী সিএনএনকে বলেন, কর্তৃপক্ষ এখনো নারীদের সরাসরি বাধা দিতে দ্বিধা করছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তেহরানের অনেক নারী এখন মাথায় স্কার্ফ ছাড়াই চলাফেরা করছেন এবং বিভিন্ন ধরনের পোশাক পরছেন।
তার মতে, সরকার আবার নারীদের আগের মতো বাধ্যতামূলকভাবে হিজাব পরাতে পারবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
তবে ইরানের কট্টরপন্থিরা বিষয়টিকে দেশের ধর্মীয় পরিচয় রক্ষার লড়াই হিসেবে দেখছেন। ফলে হিজাব নিয়ে সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত, অর্থনৈতিক সংকট ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি সামলাতে হচ্ছে তেহরানকে। অন্যদিকে বাধ্যতামূলক হিজাব নিয়ে নতুন করে বড় ধরনের সামাজিক সংঘাত তৈরি হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তাই আপাতত নারীদের হিজাব পরানোর বিষয়ে সরকার কতটা কঠোর হবে, সেটিই হয়ে উঠেছে বড় প্রশ্ন।




Comments