নিজ হাতে গড়েছেন অট্টালিকা, সেই ভিটাতেই ৪০ বছর শিকলে বন্দি বৃদ্ধ শফিকুল!
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার চন্দ্রপুর ইউনিয়নের লতাবর গ্রাম। উত্তর বালাপাড়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে গড়ে ওঠা একটি পাকা দালানে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই দিন কাটছে এক পরিবারের সদস্যদের। কিন্তু সেই চোখধাঁধানো অট্টালিকার পাশেই এক করুণ ও অমানবিক দৃশ্য। যে মানুষটির রক্ত জল করা পরিশ্রমে এই সম্পদ ও আভিজাত্য গড়ে উঠেছে, সেই আশি বছর বয়সী বৃদ্ধ শফিকুল ইসলামের ঠাঁই হয়েছে মাত্র ৫০ গজ দূরের একটি নিভৃত গুদামঘরের উন্মুক্ত বারান্দায়। সেখানে গত ৪০ বছর ধরে পায়ে লোহার শিকল জড়িয়ে ধুঁকে ধুঁকে কাটছে তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়।
এক সময় শফিকুল ইসলাম ছিলেন অদম্য সাহসী ও পরিশ্রমী এক যুবক। নিজের মেধা ও হাড়ভাঙা খাটুনিতে তিনি প্রায় ২৫ দোন (প্রায় ৬৭৫ শতাংশ) জমি ক্রয় করেছিলেন। এলাকায় সম্পদশালী হিসেবে তাঁর বেশ সুনাম ছিল। স্ত্রী, দুই ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে ছিল তাঁর সাজানো সংসার। কিন্তু যৌবনের শেষভাগে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলায় ওলটপালট হয়ে যায় সব। অভাব না থাকলেও সঠিক চিকিৎসার অভাবে দীর্ঘ চার দশক ধরে তাঁর ঠিকানা হয়েছে একচিলতে বারান্দার একটি পুরনো কাঠের চৌকি।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, শুরুতে ওঝা-কবিরাজ দিয়ে অপচিকিৎসায় সময় নষ্ট হলেও পরে তাঁকে রংপুর মেডিকেল কলেজ ও পাবনা মানসিক হাসপাতালেও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় চিকিৎসকের পরামর্শে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়। এরপর থেকেই নিরুদ্দেশ হওয়া বা অন্যের ওপর আঘাত করার ভয়ে তাঁর পায়ে পরিয়ে দেওয়া হয় লোহার শিকল। সেই থেকে খাওয়া, ঘুমানো কিংবা শৌচকার্য—সবই চলছে ওই একচিলতে জায়গায়।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, পরিবারের লোকজন পাকা দালানে থাকলেও শফিকুলের কপালে জোটেনি একটি মশারি বা একটু বাতাসের ছোঁয়া। রোদ-বৃষ্টি কিংবা হাড়কাঁপানো শীত—প্রকৃতির সব প্রতিকূলতা সহ্য করেই তিনি পড়ে আছেন এই জরাজীর্ণ বারান্দায়। সপ্তাহে এক দিন বড় ছেলে মাহবুবুর রহমান তাঁকে গোসল করিয়ে দেন এবং মলমূত্র পরিষ্কার করেন। মেজাজ খিটখিটে হওয়ায় পরিবারের কেউ কাছে গেলে তিনি তেড়ে আসেন, যা দীর্ঘদিনের অবহেলা আর মানসিক যন্ত্রণারই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করেন প্রতিবেশীরা।
শফিকুলের বড় মেয়ে রেহানা বেগম একজন ইউপি সদস্য হওয়া সত্ত্বেও বাবার উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা কেন হয়নি, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। পরিবারের দাবি, প্রচুর জমিজমা থাকলেও আইনি জটিলতায় তা বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না বলে অর্থাভাবে উন্নত চিকিৎসা করানো যাচ্ছে না।
স্থানীয়রা আক্ষেপ করে বলেন, যে মানুষটি কঠোর পরিশ্রমে সন্তানদের জন্য অট্টালিকা গড়ে দিলেন, আজ সেই সম্পদই তাঁর সুচিকিৎসার কাজে আসছে না। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে শিকলবন্দি শফিকুলের নিষ্পাপ চাউনি যেন আজ সমাজ ও বিবেকের কাছে এক নীরব প্রতিবাদ।
মানবকণ্ঠ/ডিআর




Comments