Image description

ভালো বেতনের চাকরির আশায় চড়া সুদে ঋণ নিয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন রাশিয়ায়। লক্ষ্য ছিল পরিবারের অভাব দূর করা। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার যুবক রিমেল মিয়াকে (২০) বাধ্য হয়ে নামতে হয়েছে ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখ সমরে। বর্তমানে তিনি ইউক্রেনীয় বাহিনীর হাতে যুদ্ধবন্দী হিসেবে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। দীর্ঘ ১১ মাস নিখোঁজ থাকার পর সম্প্রতি তিনি বেঁচে আছেন—এমন খবরে পরিবারে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও তাকে দেশে ফেরানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে স্বজনদের।

রিমেল মিয়া সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ছাপড়হাটী ইউনিয়নের উত্তর মরুয়াদহ গ্রামের সৈয়দ আলী ও রেখা দম্পতির দ্বিতীয় সন্তান। রিমেল ২০২২ সালে শোভাগঞ্জ উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন এবং ২০২৪ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। কিন্তু বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতির কারণে তার পড়াশোনা আর শেষ করা হয়নি।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের মার্চ মাসে নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে রাশিয়ায় যান রিমেল। শুরুতে একটি প্রতিষ্ঠানে ৭০০ মার্কিন ডলার বেতনে কাজ করলেও পরে কাজ হারিয়ে ফেলেন তিনি। বৈধভাবে রাশিয়ায় থাকার উপায় খুঁজতে গিয়ে তিনি রুশ ভাষায় লেখা একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। রুশ ভাষা বুঝতে না পারায় তিনি জানতেন না যে সেটি রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার চুক্তি ছিল।

স্বজনদের দাবি, উচ্চ বেতন ও রুশ নাগরিকত্বের প্রলোভন দেখিয়ে মাত্র তিন দিনের নামমাত্র প্রশিক্ষণ শেষে রিমেলকে যুদ্ধের সম্মুখ সমরে পাঠিয়ে দেয় রুশ বাহিনী। প্রায় এক মাস দায়িত্ব পালনের পর ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর তিনি ইউক্রেনীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন। সম্প্রতি ইউক্রেনের একটি আটক কেন্দ্র থেকে জুমের মাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রিমেল বলেন, ‘আমার পরিবার জানত না আমি কোথায় আছি বা বেঁচে আছি কি না। এই সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তারা অন্তত জানতে পারল যে আমি এখনও বেঁচে আছি।’

রিমেলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, একটি জীর্ণ ঝুপড়ি ঘরে মানবেতর জীবনযাপন করছে তার পরিবার। তাকে বিদেশে পাঠাতে প্রায় ৬ লাখ টাকা ঋণ করা হয়েছে, যা এখনও পরিশোধ হয়নি। রিমেলের বাবা সৈয়দ আলী শোভাগঞ্জ বাজারে একটি ছোট পানের দোকান চালিয়ে সংসার চালান। তিনি বলেন, ‘ধারদেনা করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছি। প্রায় ১১ মাস তার কোনো খোঁজ ছিল না। এখন শুনছি সে যুদ্ধবন্দী। সরকারের কাছে আমার একটাই আবেদন, যত দ্রুত সম্ভব আমার ছেলেকে দেশে ফিরিয়ে আনা হোক।’

মা রেখা বেগম কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, ‘ছেলের জন্য প্রতিদিন আল্লাহর কাছে দোয়া করেছি। ভেবেছিলাম আর কোনো দিন তাকে দেখতে পাব না। এখন জানতে পারলাম সে বেঁচে আছে। আমি শুধু একবার আমার ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরতে চাই।’

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ফর্টিফাই রাইটস ও ইউক্রেন ভিত্তিক ট্রুথ হাউন্ডসের তথ্য অনুযায়ী, কাজের প্রলোভনে রাশিয়ায় যাওয়া বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি বিভিন্নভাবে রুশ সেনাবাহিনীতে যুক্ত হয়ে পড়েছেন। তাদের মধ্যে কেউ নিহত হয়েছেন, আবার কেউ যুদ্ধবন্দী হয়েছেন। বর্তমানে ইউক্রেনের আটক কেন্দ্রে থাকা রিমেলসহ অন্য বাংলাদেশিরা কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইফফাত জাহান তুলি এবং গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। রিমেলকে ফিরে পেতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে তার পরিবার ও এলাকাবাসী।

মানবকণ্ঠ/ডিআর