ক্ষেতলালে মাদ্রাসায় নিয়োগে জাল সনদ ও ১০ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ
জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার কৃষ্ণনগর দাখিল মাদ্রাসায় নৈশপ্রহরী পদে নিয়োগকে ঘিরে জাল সনদ তৈরি, প্রধান শিক্ষকের স্বাক্ষর জালিয়াতি, বিপুল অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ এবং প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং সংরক্ষিত অডিও-ভিডিওর ভিত্তিতে এই ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিয়োগপ্রাপ্ত মিজানুর রহমান ২০১১ সালে কালাই উপজেলার হারুঞ্জা দাখিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা ওই সনদেই প্রমাণিত হওয়ার কথা থাকলেও চাকরির আবেদনপত্রের সঙ্গে বড়তারা উচ্চ বিদ্যালয়ের নামে ২০০৮ সালের একটি অষ্টম শ্রেণির সনদ সংযুক্ত করা হয়, যা নিয়েই বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
বড়তারা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু তাহের বলেন, "মিজানুর রহমান কখনোই আমার বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন না। কৃষ্ণনগর দাখিল মাদ্রাসার সুপার শহিদুল ইসলাম সনদটি নিবন্ধনের (রেজিস্ট্রেশন) জন্য আমার কাছে নিয়ে এলে আমি তা প্রত্যাখ্যান করি। কারণ, ওই নামে আমাদের বিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষার্থীর অস্তিত্ব নেই। পরবর্তীতে আমার স্বাক্ষর এবং বিদ্যালয়ের প্যাড জাল করে কম্পিউটারে এই ভুয়া সনদটি তৈরি করা হয়েছে।"
অনুসন্ধানকালে নিয়োগপ্রাপ্ত মিজানুর রহমানও অষ্টম শ্রেণির ওই সনদ সংগ্রহের বিষয়টি অস্বীকার করেননি। তিনি অকপটে স্বীকার করেন যে, চাকরি পাওয়ার উদ্দেশ্যেই তিনি ওই সনদ ব্যবহার করেছেন এবং ‘মেহেদী স্যার’ নামে এক শিক্ষকের কাছ থেকে সেটি সংগ্রহ করেছেন।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, যেখানে একজন প্রার্থী ইতোমধ্যেই দাখিল পাসের মূল সনদধারী, সেখানে আবার অষ্টম শ্রেণির একটি পৃথক সনদের কেন প্রয়োজন হলো? আর সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয় যে সনদটি ভুয়া বলে দাবি করছে, সেটি ব্যবহার করে কীভাবে সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী নিয়োগ সম্পন্ন হলো—এই প্রশ্ন এখন মুখে মুখে।
অভিযোগের আরও গুরুতর দিক হলো অর্থ লেনদেন। মিজানুর রহমান নিজেই দাবি করেন, নৈশপ্রহরী পদে নিয়োগের জন্য তিনি মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতিকে ১০ লাখ টাকা দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি মাদ্রাসার সুপার শহিদুল ইসলামকে ৪ শতক জমি লিখে দিয়েছেন বলেও জানান। এসব কথোপকথনের অডিও রেকর্ড সংরক্ষিত রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, কৃষ্ণনগর দাখিল মাদ্রাসার স্বীকৃতির মেয়াদ ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে শেষ হয়ে গেছে। বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের নীতিমালা অনুযায়ী, স্বীকৃতি নবায়ন ছাড়া নতুন নিয়োগ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করতে না পারায় প্রতিষ্ঠানটি তিনবার আবেদন করেও পূর্ণাঙ্গ স্বীকৃতি নবায়ন পায়নি।
তা সত্ত্বেও অভিযোগ উঠেছে যে, স্বীকৃতির বিষয়টি গোপন রেখে স্থানীয়ভাবে স্বল্প প্রচারিত দুটি পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এরপর ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে নিয়োগ বোর্ড গঠন করে শাহনাজ বেগমকে আয়া এবং মিজানুর রহমানকে নৈশপ্রহরী পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে তাঁদের যোগদানও সম্পন্ন করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, এই দুটি নিয়োগে প্রায় ১৮ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মাদ্রাসার সুপার শহিদুল ইসলাম সাংবাদিকদের প্রশ্নের কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। তিনি কেবল বলেন, "নিয়োগ সম্পূর্ণ বৈধ। মিজানুর দাখিল ও আলিম পাস করেছে। মাদ্রাসার সনদ দিয়েই সে আবেদন করেছে এবং বর্তমানে বেতন-ভাতা পাচ্ছে।" তবে বড়তারা উচ্চ বিদ্যালয়ের কথিত অষ্টম শ্রেণির সনদ, প্রধান শিক্ষকের স্বাক্ষর জালিয়াতি কিংবা নিয়োগে অর্থ লেনদেনের বিষয়ে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি সোহাগ মণ্ডলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে সামনাসামনি কথা বলবেন। তবে পরবর্তীতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি আর সাড়া দেননি।
জয়পুরহাটের ভারপ্রাপ্ত জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আজিজুল হাকিম এ প্রসঙ্গে বলেন, "বিষয়টি আগে আমাদের জানা ছিল না। অভিযোগ সত্য হলে তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুততম সময়ে সর্বোচ্চ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"
মানবকণ্ঠ/ডিআর




Comments