কুমিল্লার দেবিদ্বারে ফরিদা ইয়াসমিন (৫৫) নামে এক বাড়ির মালিককে হত্যার পর মরদেহ খণ্ড খণ্ড করে পলিথিনের প্যাকেটে মুড়িয়ে বাড়ির পেছনে ফেলে রাখার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় লাইলী আক্তার (৩৩) নামে এক নারী ভাড়াটিয়াকে আটক করেছে পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে মরদেহের বিভিন্ন অংশের একাধিক প্যাকেট উদ্ধার করা হয়েছে। শনিবার (৮ আগস্ট) বিকেলে দেবিদ্বার পৌর এলাকার ছোট আলমপুরের পূর্বাশা আবাসিক এলাকার ভূঁইয়া হাউজে এ ঘটনা ঘটে। রোববার বিকেল পর্যন্ত মরদেহের বিভিন্ন অংশের ১৩টি প্যাকেট পাওয়া গেছে বলে স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
আটক লাইলী আক্তার দেবিদ্বার পৌর এলাকার চাপানগর গ্রামের আবুল কালাম আজাদের স্ত্রী। পুলিশ জানিয়েছে, তিনি প্রায় ১২ দিন আগে ফরিদা ইয়াসমিনের বাড়ির একটি কক্ষ ভাড়া নেন। নিহত ফরিদা ইয়াসমিন দেবিদ্বার পৌরসভার ফতেহাবাদ গ্রামের মফিজুল ইসলামের স্ত্রী। তাঁর স্বামী চট্টগ্রামে জাহাজে চাকরি করেন। দীর্ঘদিন ধরে ফরিদা ইয়াসমিন ছোট আলমপুরের ওই বাড়িতে স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন। পরিবারের সদস্যরা জানান, ফরিদার দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। ছোট মেয়ে মরিয়ম আক্তার মায়ের সঙ্গে থাকতেন। শুক্রবার তিনি শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ায় ওই রাতে ফরিদা বাসায় একাই ছিলেন। তাঁর একমাত্র ছেলে ইব্রাহীম খলিলও প্রায় ১০ বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান।
পরিবারের দাবি, শনিবার সকালে ফরিদার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ না পেয়ে স্বজনরা তাঁকে খুঁজতে শুরু করেন। একপর্যায়ে বাড়ির ভাড়াটিয়া লাইলী আক্তারের কথাবার্তায় সন্দেহ হলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে বাড়ির পেছনে খোঁজ করে পলিথিনে মোড়ানো মরদেহের অংশ পাওয়া যায়। নিহতের মেয়ে মরিয়ম আক্তার বলেন, শুক্রবার তিনি শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার পর রাতে তাঁর মা একাই ছিলেন। শনিবার সকালে বাবার ফোন পেয়ে তিনি বাড়িতে এসে মাকে খুঁজতে শুরু করেন। পরে লাইলীকে জিজ্ঞাসাবাদে তাঁর কথাবার্তায় অসঙ্গতি ধরা পড়ে বলে দাবি করেন তিনি। মরিয়মের অভিযোগ, তাঁর মাকে হত্যার পর বাড়ির কাজের জন্য রাখা প্রায় ৭ লাখ টাকা ও প্রায় ১৫ ভরি স্বর্ণালংকার নিয়ে গেছে হত্যাকারীরা।
ঘটনার পর স্থানীয়রা লাইলী আক্তারকে আটক করে গণপিটুনি দেন বলে জানা গেছে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য দেবিদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখানেও বিক্ষুব্ধ লোকজন তার ওপর হামলার চেষ্টা করে বলে স্থানীয়রা জানান। পরে পুলিশ তাকে থানায় নিয়ে যায়। পুলিশ জানায়, শনিবার রাতে ফরিদা ইয়াসমিনের মরদেহের খণ্ডিত অংশের কয়েকটি প্যাকেট উদ্ধার করা হয়। রোববার বিকেল পর্যন্ত আরও কয়েকটি প্যাকেট উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া অংশগুলোর মধ্যে একটি মাথার অংশ রয়েছে বলেও পুলিশ জানিয়েছে।
এ ঘটনায় শনিবার রাতে নিহতের স্বামী মফিজুল ইসলাম বাদী হয়ে চারজনকে আসামি করে মামলা করেছেন। দেবিদ্বার-ব্রাহ্মণপাড়া সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মো. শাহীন বলেন, ‘লাইলী আক্তার ২০২১ সালে শিশু ফাহিমা হত্যাকাণ্ডেও জড়িত ছিলেন। তিনি কয়েক মাস আগে কারাগার থেকে জামিনে ছাড়া পান। এরপর বিভিন্ন জায়গায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন। প্রায় ১২ দিন আগে তিনি এই বাসায় ভাড়া ওঠেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাড়ির মালিকের স্বর্ণালংকারের লোভে তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে আরও কয়েকজনের নাম পাওয়া গেছে। তাদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’ উল্লেখ্য, ২০২১ সালের নভেম্বরে দেবিদ্বারে পাঁচ বছরের শিশু ফাহিমা আক্তার হত্যাকাণ্ডে লাইলী আক্তারসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছিল র্যাব। র্যাবের সে সময়ের বক্তব্য অনুযায়ী, আমির হোসেনের সঙ্গে লাইলীর সম্পর্কের বিষয়টি শিশু ফাহিমা দেখে ফেলায় তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। পরে শিশুটির মরদেহ বস্তাবন্দি অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
ওই মামলায় লাইলী আক্তার আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিলেন বলে ২০২১ সালের সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এদিকে, প্রায় পাঁচ বছর পর একই ব্যক্তির নাম নতুন একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আসায় দেবিদ্বারে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তবে নতুন হত্যাকাণ্ডে লাইলী আক্তারসহ অন্যদের সম্পৃক্ততা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এম আর এ




Comments