পাঁচ মাসেও ফেরেনি ইয়াসিন, এবার মুক্তিপণের দাবিতে উৎকণ্ঠায় পরিবার
ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার আচারগাঁও ইউনিয়নের সিংদই কোনাঘাটা গ্রামের হারুন মিয়ার ছেলে ইয়াসিন (১৭) গত পাঁচ মাস ধরে নিখোঁজ। দীর্ঘ সময় ধরে ছেলের কোনো সন্ধান না পাওয়া এবং তাকে উদ্ধারে আইনি সহায়তা ও তদন্তের দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় চরম উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন দিনমজুর বাবা হারুন মিয়া ও পরিবারের সদস্যরা।
ইয়াসিনকে উদ্ধারে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপের দাবিতে সাংবাদিক সম্মেলন করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা।
ইয়াসিনের বাবা হারুন মিয়া সাংবাদিকদের জানান, প্রায় পাঁচ মাস আগে রাত ১০টার দিকে স্থানীয় সেলিম, ফয়সাল ও জিহাদ ইয়াসিনকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যান। এরপর থেকে ইয়াসিন আর বাড়িতে ফেরেনি। প্রথম দিকে পরিবারের সদস্যরা আত্মীয়স্বজনের বাড়িসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় খোঁজাখুঁজি করেন। পরে বিভিন্ন স্থানে সন্ধান চালিয়েও তার কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।
ছেলে নিখোঁজ হওয়ার পরপরই তিনি নান্দাইল মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ করেন বলে জানান হারুন মিয়া। তবে তার অভিযোগটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত (এফআইআর) করা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। এ সময় সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তা এসআই দেব লালের বিরুদ্ধে সময়ক্ষেপণের অভিযোগও করেন হারুন মিয়া।
তার ভাষ্য, ছেলেকে উদ্ধারের আশায় দীর্ঘদিন থানায় গিয়ে এসআই দেব লালের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন তিনি। কিন্তু ‘আজ-কাল’ করে তাকে ঘোরানো হয়েছে বলে অভিযোগ তার। একপর্যায়ে পুলিশের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সহায়তা না পেয়ে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আনতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ও র্যাব-১৪ সদর দপ্তরেও লিখিত অভিযোগ করেন বলে জানান তিনি।
পরবর্তীতে কোনো উপায় না পেয়ে ময়মনসিংহ জেলা বিজ্ঞ শিশু আদালতে সেলিম, ফয়সাল, জিহাদ ও সুরুজ মিয়াসহ চারজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন হারুন মিয়া। তার দায়ের করা মামলাটির নম্বর ৫৫/২০২৬। মামলাটি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে বলে জানান তিনি।
হারুন মিয়ার দাবি, মামলাটি তদন্তের জন্য গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) উপপরিদর্শক অংকর সরকারকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়নি। ফলে ইয়াসিন কোথায় আছে, তার সঙ্গে কী ঘটেছে কিংবা তাকে কোথায় রাখা হয়েছে—এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর মিলছে না বলে দাবি পরিবারের।
নিখোঁজের পাঁচ মাসেও তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন পরিবারের সদস্যরা। তারা দ্রুত তদন্ত শেষ করে ইয়াসিনের অবস্থান শনাক্ত করার পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে হারুন মিয়া জানান, ইয়াসিন নিখোঁজের ঘটনায় তিন-চার দিন আগে সেলিমের বাবা সদাগর মিয়াসহ আরও দুই-তিনজন তার সঙ্গে দেখা করেন। এ সময় তারা ইয়াসিনকে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলে ৬ লাখ টাকা দাবি করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। দ্রুত টাকা জোগাড় করে তাদের হাতে তুলে দিলে ইয়াসিনকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে বলেও তারা জানিয়েছেন বলে দাবি হারুন মিয়ার।
তবে দিনমজুর হওয়ায় এত বিপুল পরিমাণ টাকা জোগাড় করা তার পক্ষে অসম্ভব বলে জানান তিনি। একদিকে একমাত্র ছেলের কোনো সন্ধান নেই, অন্যদিকে কথিত মুক্তিপণের দাবি—সব মিলিয়ে চরম দুশ্চিন্তার মধ্যে রয়েছেন তিনি।
পরিবারের সদস্যরা আরও জানান, ইয়াসিন নিখোঁজ হওয়ার পর ফয়সার মিয়ার মোবাইল ফোনে একটি অডিও রেকর্ড পাওয়া যায়। ওই অডিওতে সেলিমের কণ্ঠে ইয়াসিনকে হত্যার হুমকি দেওয়ার কথা শোনা যায় বলে তাদের দাবি। পরিবারের অভিযোগ, ওই অডিও রেকর্ডের তথ্য যাচাই এবং ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে দ্রুত ইয়াসিনের অবস্থান শনাক্ত ও তাকে উদ্ধারের ব্যবস্থা করা হোক।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে ইয়াসিনের বাবা হারুন মিয়া বলেন, ‘আমি একজন দিনমজুর মানুষ। মানুষের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালাই। আমার একমাত্র ছেলে পাঁচ মাস ধরে নিখোঁজ। সে জীবিত না মৃত, কিছুই জানি না। আমার কাছে টাকা নেই বলে কি আমি আইনি সহায়তা পাব না? আমি শুধু আমার ছেলেকে ফিরে পেতে চাই।’
ইয়াসিনের পরিবারের দাবি, দীর্ঘ পাঁচ মাস ধরে নিখোঁজ থাকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করা হোক। একই সঙ্গে কথিত ৬ লাখ টাকা মুক্তিপণের দাবির সত্যতা যাচাই, অডিও রেকর্ড পরীক্ষা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ইয়াসিনকে উদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।
অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত সেলিম, ফয়সাল, জিহাদ ও সুরুজ মিয়ার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে নান্দাইল মডেল থানার এসআই দেব লাল বলেন, ‘নিখোঁজের ঘটনায় বাবা হারুন মিয়া অভিযোগ করেছিলেন। ওই সময় অফিসার ইনচার্জ কর্মরত না থাকায় অভিযোগটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত (এফআইআর) করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে শুনেছি, পরিবারের সদস্যরা ময়মনসিংহের বিজ্ঞ আদালতে এ বিষয়ে মামলা দায়ের করেছেন।’
এসএ




Comments