Image description

এক সময় যে জনপদে ভোর হতো সাইরেনের শব্দে, আজ সেখানে বিরাজ করছে শ্মশানের নীরবতা। সেই সাইরেনের ডাক শুনেই এককালে ঘুম ভাঙত মহিমাগঞ্জের মানুষের; ছুটত আখ বোঝাই ট্রাক-ট্রলির সারি, চিমনি থেকে উঠত অবিরাম ধোঁয়া আর বাতাসে ভাসত দেশীয় চিনির ম ম গন্ধ। আজ ১৬ আগস্ট, ছয় বছর হতে চলেছে সেই চেনা সাইরেন আর বাজে না। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মহিমাগঞ্জে ঢুকতেই চোখে পড়ে এক বিষণ্ণ দৃশ্য—বিশাল ফটক, দীর্ঘ প্রাঙ্গণ আর সারি সারি পুরোনো স্থাপনা যেন থমকে আছে হারিয়ে যাওয়া এক সোনালী সময়ে। প্রায় ছয় বছর ধরে বন্ধ থাকা রংপুর চিনিকলের সঙ্গে স্তব্ধ হয়ে আছে হাজারো পরিবারের জীবিকার চাকা। যন্ত্র থেমেছে, কিন্তু থেমে নেই সময়ের ক্ষয়; প্রতিদিন একটু একটু করে জং ধরছে এখানকার কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতিতে।

১৯৫৪ থেকে ১৯৫৭ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত রংপুর চিনিকলে ১৯৫৭-৫৮ মৌসুমে চিনি উৎপাদন শুরু হয়। ১ হাজার ৯২৫ দশমিক ৩৫ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি ছিল একসময় উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক হৃৎস্পন্দন। বার্ষিক ১৫ হাজার মেট্রিক টন চিনি উৎপাদনক্ষম এই মিলকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল কৃষি, ব্যবসা, পরিবহন ও জনজীবনের এক শক্তিশালী বলয়। গাইবান্ধাসহ পার্শ্ববর্তী সাতটি উপজেলার হাজার হাজার কৃষক আখ চাষ করতেন। ২০২০ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন সরকার আখ মাড়াই স্থগিত ঘোষণা করলে হঠাৎ করেই থেমে যায় এর অগ্রযাত্রা। এর আগে ২০০৪ সালের মার্চ মাসে মিলটি প্রথমবার লে-অফ করা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে ২০০৬ সালের আগস্টে পুনরায় চালু হয়। বর্তমানে চিনিকলের মূল প্রাঙ্গণের ৩৫ একর কারখানা এলাকা আগাছা আর জঙ্গলের দখলে। খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকা আখ পরিবহনের গাড়িগুলো মরিচায় ক্ষয়ে যাচ্ছে, কারখানার ভেতরের অমূল্য যন্ত্রপাতি নিঃশব্দে অকেজো হয়ে পড়ছে। এই জং শুধু লোহার যন্ত্রে ধরেনি, ধরেছে এই অঞ্চলের মানুষের স্বপ্নেও।

মিল বন্ধ হওয়ার পর চুক্তিভিত্তিক ও মৌসুমি শ্রমিকদের জীবনে নেমে এসেছে চরম বিপর্যয়। জীবিকার তাগিদে দক্ষ শ্রমিকরা এখন ভ্যান চালাচ্ছেন কিংবা দিনমজুরি করছেন। অনেকে কাজের সন্ধানে এলাকা ছেড়েছেন। অভাবের তাড়নায় বহু পরিবারে সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে, নেই সুচিকিৎসার সংস্থান। শ্রমিক নেতারা বলছেন, কেবল কারখানা বন্ধ হয়নি, বন্ধ হয়েছে হাজার হাজার মানুষের সম্মান ও বাঁচার অধিকার। একইভাবে করুণ দশা আখ চাষিদের। একসময় আখের ওপর নির্ভরশীল চাষিরা এখন দিশেহারা। প্রবীণ এক চাষির আক্ষেপ—"মিল ছিল বলেই মাঠে আখ ছিল, ঘরে টাকা ছিল আর বাজারে প্রাণ ছিল। এখন সবই স্মৃতি।"

উৎপাদন বন্ধ থাকলেও বন্ধ নেই প্রশাসনিক ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ। বর্তমানে এখানে ৯২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত আছেন। প্রতি মাসে বেতন-ভাতাসহ রক্ষণাবেক্ষণে সরকারের ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২০ লাখ টাকা। গত ৬৮ মাসে এই খাতে মোট ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪ কোটি টাকা। একদিকে যেমন কোটি কোটি টাকা খরচ হচ্ছে, অন্যদিকে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে শত শত কোটি টাকার যানবাহন ও যন্ত্রপাতি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অন্তত ২০ হাজার মানুষের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থবির হয়ে পড়েছে স্থানীয় অর্থনীতি।

চিনিকল শ্রমিক নেতা আবু সুফিয়ান সুজা বলেন, "অবহেলায় পড়ে থাকা শত শত কোটি টাকার সম্পদ ধ্বংস হচ্ছে। এই কারখানা সচল হলে কর্মসংস্থানের ব্যাপক সুযোগ তৈরি হবে।" চিনিকলের ইনচার্জ মোহাম্মদ শাহিনুর ইসলাম জানান, মাত্র ৭০-৮০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করলেই মিলটি পুনরায় সচল করা সম্ভব, যা হাজারো মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করবে।

সম্প্রতি শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলো পুনরায় চালু করার বিষয়ে সরকারের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তিনি জানান, আধুনিকায়ন ও নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে মিলগুলোকে লাভজনক করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। গাইবান্ধা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন জানান, মিলটি দ্বিতীয় ধাপে চালুর সম্ভাবনা নিয়ে সরকারকে অবহিত করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক মাসুদুর রহমান মোল্লাও মিলটি চালু হওয়াকে এলাকার অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।

মহিমাগঞ্জের নীরব প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে আজ সাধারণ মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন—শিল্পমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি কি সত্যি হবে? দীর্ঘ ছয় বছরের নীরবতা ভেঙে সাইরেন কি আবার বেজে উঠবে? সেই কাঙ্ক্ষিত উত্তরের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে উত্তর জনপদের হাজারো মানুষ।

ডিআর