রামঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত ৪০০ বছরের ভবন ভেঙে ফেলার অভিযোগ মন্দির কমিটির বিরুদ্ধে
শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ডিঙ্গামানিক এলাকায় শ্রীশ্রীসত্যনারায়ণের সেবামন্দিরের প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো একটি ঐতিহ্যবাহী দ্বিতল ভবন ভেঙে ফেলার অভিযোগ উঠেছে মন্দির পরিচালনা কমিটির সহসভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে। ভবনটি শ্রীশ্রী রামঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত বলে দাবি ভক্ত ও স্থানীয়দের। তাদের অভিযোগ, ভবনটি ভাঙার আগে সেবামন্দিরের ভারপ্রাপ্ত মোহন্ত ও যুবরাজ শ্রীমৎ সুভাষ চক্রবর্তী এবং কমিটির অধিকাংশ সদস্যকে অবহিত করা হয়নি।
তবে মন্দির পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও সহসভাপতির দাবি, ভবনটি দীর্ঘদিনের পুরোনো হওয়ায় জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছিল। ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও সংস্কারকাজের স্বার্থে সেটি অপসারণ করা হয়েছে।
মন্দির ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৮৬০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বর্তমান শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ডিঙ্গামানিক এলাকায় মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন শ্রী শ্রী রামঠাকুর। তাঁর বাবা শ্রী রাধামাধব চক্রবর্তী ছিলেন সাধক এবং মা শ্রীমতি কমলাদেবী চক্রবর্তী ছিলেন সেবাপরায়ণা। রামঠাকুর ছিলেন চার ভাইয়ের মধ্যে সেজো।
রামঠাকুরের আদিনিবাস ছিল নড়িয়া উপজেলার জপসা ইউনিয়নের কীর্তিনাশা নদীর তীরে। নদীভাঙনের কারণে তাঁর বাবা রাধামাধব চক্রবর্তী ডিঙ্গামানিক এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে বসবাস শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে রামঠাকুরের জন্মভূমিকে ঘিরে এখানে গড়ে ওঠে শ্রীশ্রীসত্যনারায়ণের সেবামন্দির।
প্রায় ২২ একর জায়গাজুড়ে প্রতিষ্ঠিত এই সেবামন্দির প্রাঙ্গণে মূল মন্দির ছাড়াও নাটমন্দির, মহারাজ ভবন, রামঠাকুরের জন্মঘর, দুর্গামণ্ডপ, কালীমাতার মন্দির, কমলামাধব স্মৃতি মন্দির ও মোহন্তদের স্মৃতি মন্দির রয়েছে। ভক্তদের থাকার জন্য রয়েছে দুটি চারতলা যাত্রীনিবাসসহ বিভিন্ন স্থাপনা।
মন্দির প্রাঙ্গণের দুর্গামন্দিরের পাশে থাকা পুরোনো দ্বিতল ভবনটিকে রামঠাকুরের পারিবারিক ও আধ্যাত্মিক স্মৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে দাবি করেন স্থানীয় প্রবীণ ও ভক্তরা। তাদের ভাষ্য, রামঠাকুর ও তাঁর পূর্বপুরুষেরা ভবনটি ব্যবহার করতেন। ভবনের চিলেকোঠায় লক্ষ্মী-নারায়ণ বিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত ছিল এবং সেখানে রামঠাকুর পূজা ও ধ্যান করতেন বলেও স্থানীয়দের দাবি। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হামলায় ভবনটির চিলেকোঠা ও বিগ্রহ ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে জানা যায়। এরপরও ভবনটির অবশিষ্ট অংশ রামঠাকুরের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে ভক্তদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দেশের বিভিন্ন স্থান এমনকি ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ভক্তরা ভবনটির সঙ্গে ছবি তুলতেন। কেউ কেউ ভবনের মাটি স্মৃতি হিসেবে সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন।
মন্দিরে বর্তমানে পঞ্চম মোহন্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন শ্রীমৎ ধূর্জটি প্রসাদ চক্রবর্তী। শারীরিক অসুস্থতার কারণে কয়েক বছর ধরে তিনি দায়িত্ব পালনে সীমিত থাকায় মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ভারপ্রাপ্ত মোহন্ত ও যুবরাজ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে শ্রীমৎ সুভাষ চক্রবর্তীকে। তাঁকে সভাপতি করে ১৭ সদস্যের একটি পরিচালনা কমিটিও রয়েছে।
গত ৯ সেপ্টেম্বর সংস্কারকাজের অংশ হিসেবে সেবামন্দিরের নাটমন্দির, লক্ষ্মণঘর ও মোহন্তদের বিশ্রামঘর ভেঙে ফেলা হয়। একই সময় রামঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত ওই পুরোনো ভবনটিও এক্সকাভেটর দিয়ে ভেঙে ফেলা হয়। এরপর থেকেই বিষয়টি নিয়ে মন্দিরের ভক্ত ও কমিটির সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
রামঠাকুরের আত্মীয় ও স্থানীয় বাসিন্দা শিল্পী রানী চক্রবর্তী বলেন, “পুরোনো ভবনটি ঠাকুরের দাদুর বাড়ি হিসেবে পরিচিত ছিল। আমার দিদি-শাশুড়ি ১০২ বছর বয়সে মারা গেছেন। তিনি বলতেন, রামঠাকুর বাড়িতে এলে ভবনের চিলেকোঠায় ধ্যান করতেন। এ কারণে জায়গাটি ধ্যানঘর হিসেবেও পরিচিত ছিল। ভবনটি ভেঙে ফেলার বিষয়ে আমরা কেউ আগে জানতাম না। অনেকে এটি সংস্কার করে সংরক্ষণের কথা বলেছিলেন এবং অনুদান দেওয়ার আগ্রহও প্রকাশ করেছিলেন।”
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের শরীয়তপুরের আহ্বায়ক বিজন চন্দ্র মজুমদার বলেন, “ভবনটি রামঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। এটি সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করা উচিত ছিল। মোহন্তকে অবহিত না করে এটি ভেঙে ফেলার বিষয়টি দুঃখজনক। অবশিষ্ট ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো অন্তত সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।”
মন্দির পরিচালনা কমিটির কোষাধ্যক্ষ বলরাম দাস বলেন, “ভবনটি ভাঙার বিষয়ে আমাকে জানানো হয়নি। কমিটির অধিকাংশ সদস্যও বিষয়টি জানতেন না। এটি যদি কমিটির সিদ্ধান্তে করা হতো, তাহলে অবশ্যই সদস্যদের জানানো হতো।”
কমিটির সদস্য ত্রিনাথ ঘোষ বলেন, “রামঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত ভবনটি ভেঙে ফেলায় আমরা অত্যন্ত মর্মাহত। কমিটির অন্য সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা না করেই এটি করা হয়েছে। বিষয়টি ভারপ্রাপ্ত মোহন্ত অবগত হয়েছেন। তিনি দেশে ফিরে কমিটির সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন।”
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মন্দির পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মুকুল চন্দ্র রায় বলেন, “ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল। চুন-সুরকির গাঁথুনির ভবনটি সংস্কার বা মেরামতের উপযোগী ছিল না। তাই নতুন করে নির্মাণের পরিকল্পনায় এটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। এর আগেও রামঠাকুরের জন্মঘর পুরোনো হয়ে যাওয়ায় সেটি ভেঙে নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছে।”
কমিটির সহসভাপতি বিশ্বনাথ চক্রবর্তী বলেন, “ভবনটি বিভিন্ন গাছপালা ও জঞ্জালে পরিপূর্ণ হয়ে পড়েছিল। ভবিষ্যতে সেখানে উন্নয়নকাজের স্বার্থে ভবনটি অপসারণ করা হয়েছে।” ভবনটি ভাঙার বিষয়ে মোহন্তকে অবহিত করা হয়েছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি মোহন্তের কাছ থেকেই জানতে হবে।
এ বিষয়ে সেবামন্দিরের ভারপ্রাপ্ত মোহন্ত ও যুবরাজ শ্রীমৎ সুভাষ চক্রবর্তীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন বলে জানান। তিনি বলেন, “চারশো বছরের ঐতিহ্যবাহী ভবনটি ভাঙার বিষয়ে মন্দির পরিচালনা কমিটির সহসভাপতি বিশ্বনাথ চক্রবর্তী আমার সঙ্গে কোনো আলোচনা করেননি। পূজার আগে বাংলাদেশে ফিরে ঠাকুরবাড়িতে যাব। তখন কমিটির সবাইকে নিয়ে বসে এ বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম বলেন, “আমরা সব সময় ঐতিহাসিক ও পুরাকীর্তি ভবন সংরক্ষণের চেষ্টা করি। তারা কেন এবং কী উদ্দেশ্যে ভবনটি ভেঙেছে, তা জনগণের সামনে স্পষ্ট করা উচিত। এ বিষয়ে কোনো রেজল্যুশন হয়ে থাকলে সেটিও প্রকাশ করা প্রয়োজন। তাদের এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার কতটুকু, সেটিও দেখার বিষয়। অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।”
ডিআর




Comments