সকাল গড়িয়ে দুপুর নামে, তবুও দেখা নেই কাঙ্ক্ষিত ক্রেতার। বিক্রেতারা অলস বসে একে অপরের সঙ্গে গল্প করে সময় পার করেন। দীর্ঘ অপেক্ষার পর বিকেলের আলো নিভে যখন রাজশাহীর বিপণিবিতানগুলোতে কিছুটা বেচাকেনা শুরু হয়, ঠিক তখনই হঠাৎ নেমে আসে ভুতুড়ে অন্ধকার। একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে কখনো এক ঘণ্টা, কখনো দেড় থেকে দুই ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় নিস্তব্ধ ও ঘুটঘুটে অন্ধকারে বসে থাকতে হয়। দিনে চার থেকে পাঁচবার লোডশেডিংয়ের নির্মম কবলে পড়ে বেচাকেনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘পিক আওয়ার’ বা মোক্ষম সময়টুকুই হারাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
অন্যদিকে, কর্মজীবীরা সারাদিন অফিস শেষে কেনাকাটা করতে এসে দেখছেন, নির্ধারিত সময়ের আগেই ঝুলে গেছে অনেক দোকানের ঝাঁপ। ফলে ক্রেতার হাতে সময় নেই, আর ব্যবসায়ীর দোকানে নেই ক্রেতা—এই দ্বিমুখী বাস্তবতায় রাজশাহীর বাণিজ্যিক অঙ্গনে চরম ধস নেমেছে।
নগরীর সাহেববাজার, ঐতিহ্যবাহী আরডিএ মার্কেট ও নিউ মার্কেট ঘুরে ব্যবসায়ী ও সাধারণ ক্রেতাদের এমন ভোগান্তির চিত্র দেখা গেছে। ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অব্যাহত ক্রেতা সংকট, দিনভর তীব্র লোডশেডিং, বিদ্যুৎ বিলের ঊর্ধ্বগতি, চড়া দোকানভাড়া, কর্মচারীদের বেতন, সরকারি ট্যাক্স, অনলাইন শপিংয়ের প্রভাব এবং ফুটপাতের আধিপত্যে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে স্থায়ী দোকান মালিকদের। এর ওপর বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে রাত ৮টার মধ্যে দোকান বন্ধ করার কড়াকড়ির কারণে ব্যবসার সময় নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। এতে ব্যবসায়ীদের একটাই দীর্ঘশ্বাস—‘দোকান খুলে রাখলে শুধুই খরচ বাড়ে, বন্ধ রাখলে বিক্রি নেই।’
পিক-আওয়ারে বিদ্যুৎ বিভ্রাট, সুনসান বিপণিবিতান
রাজশাহীর বিপণিবিতানগুলোতে সকাল থেকে দুপুরের চড়া রোদে ক্রেতাদের আনাগোনা থাকে হাতেগোনা। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার পর থেকেই বাজার জমে ওঠে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই সন্ধ্যাবীরতিতেই ঘটছে তীব্র ছন্দপতন।
আরডিএ মার্কেটের পোশাকের গলিগুলোতে একসময় যেখানে পা ফেলার জায়গা থাকত না, সেখানে এখন বিরাজ করছে অস্বাভাবিক নীরবতা। জুতা, অলংকার, প্রসাধনী ও গৃহস্থালি পণ্যের দোকানেও বেচাকেনা তলানিতে। বিক্রেতারা জানান, সারাদিন দোকান খুলে রাখার পর হাতেগোনা কয়েকজন ক্রেতা আসেন। অনেকে পণ্য দেখে দরদাম করলেও শেষ পর্যন্ত না কিনেই ফিরে যান। কোনো ধর্মীয় উৎসব বা বিশেষ কেনাকাটার মৌসুম না থাকলে পরিস্থিতি আরও শোচনীয় হয়ে ওঠে।
আরডিএ মার্কেটের ‘গোল্ডেন কালেকশন ফ্যাশন হাউজ’-এর মালিক ইব্রাহিম হোসেন হতাশা প্রকাশ করে বলেন, "মাসের শুরুতেই ব্যবসার অবস্থা ভয়াবহ। দোকানে কাস্টমার নেই বললেই চলে। এত বড় প্রতিষ্ঠান নিয়ে বসে আছি, কিন্তু প্রতিদিন প্রায় ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা ধরে রাখা সম্ভব হবে না।"
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের বিষয়ে তিনি বলেন, "যেটুকু সময় ক্রেতা পাওয়া যায়, বিশেষ করে সন্ধ্যার দিকে, তখনই বিদ্যুতের সমস্যা দেখা দেয়। কারেন্ট চলে গেলে এক-দেড় ঘণ্টা, কখনো দুই-তিন ঘণ্টা পর্যন্ত থাকে না। দিনে চার-পাঁচবারও বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। একটি প্রতিষ্ঠানে এভাবে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে ব্যবসা কীভাবে চলবে?"
আগে রাত ১০-১১টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখা যেত উল্লেখ করে ‘শানন্দা বস্ত্রালয়’-এর মালিক দেবু বাসার বলেন, "এখন রাত ৮টায় দোকান বন্ধ করতে হচ্ছে, ফলে ব্যবসার সময় কমে গেছে। বিক্রি না থাকলেও ব্যাংক ঋণের কিস্তি, দোকানভাড়া ও অন্যান্য খরচ ঠিকই দিতে হচ্ছে। ফলে ঋণের বোঝা টানা কঠিন হয়ে পড়েছে।"
সময়ের টানাটানিতে কর্মজীবীরা
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের পাশাপাশি দ্রুত দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন চাকরিজীবী ক্রেতারা। দিনের বড় সময় কর্মস্থলে কাটিয়ে সন্ধ্যায় মার্কেটে এসে প্রয়োজনীয় দোকান বন্ধ পাচ্ছেন তারা।
সিবিএ আইটি অ্যান্ড ফ্রিল্যান্সিং ইনস্টিটিউটের সি.ই.ও শরিফা খাতুন মানবকণ্ঠকে বলেন, "অফিস শেষ করে বের হতেই সন্ধ্যা হয়ে যায়। সন্ধ্যায় প্রয়োজনে মার্কেটে ঢুকলে দোকান বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। অফিস চলাকালীন তো আর বাজার করা সম্ভব নয়। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সবার দিক বিবেচনা করা উচিত।" বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু ব্যবসায়ীর বিক্রিতে নয়, ক্রেতার প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার সুযোগেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিক্রি ৩ হাজার, খরচ ৪ হাজার
আরডিএ মার্কেটের ‘লুক কালেকশন’-এর মালিক এববার আহমেদ তুষার জানান, গত তিন-চার মাস ধরে ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না। এর মধ্যে বিদ্যুৎ বিল, দোকানভাড়া ও কর্মচারীদের বেতন মেটাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, "কোনো দিন ৫ হাজার বা ৩ হাজার টাকা বিক্রি হয়, কোনো দিন বিক্রিই হয় না। অথচ প্রতিদিন একটি দোকানের পেছনে প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা ন্যূনতম খরচ। ফলে প্রতিদিন ঘাটতি থাকছে। বাধ্য হয়ে ৫০০ টাকার পণ্য ৩০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। ট্যাক্স ও বিদ্যুৎ বিল বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু ব্যবসা বাড়েনি। দিন দিন ব্যাংক ঋণ বাড়ছে, এই অবস্থায় আমরা কীভাবে টিকব?"
ফুটপাত ও অনলাইনে হারাচ্ছে ক্রেতা
মার্কেটের বেচাকেনায় ভাটার আরেকটি বড় কারণ ফুটপাতের দোকানের বিস্তার। সাহেববাজারের ফুটপাতগুলোতে কম দামে পোশাক মেলায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত ক্রেতারা সেখানে ঝুঁকছেন।
আরডিএ মার্কেটের ‘ফিরোজা জুয়েলার্স’-এর মালিক রুবেল হোসেন বলেন, "ফুটপাতের ব্যবসা নিম্নআয়ের মানুষের জন্য দরকার হলেও তা শৃঙ্খলার মধ্যে আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মার্কেটের ব্যবসায়ীদের টিকে থাকার সুযোগ দিতে হবে।" নিউ মার্কেটের আসাদুল ইসলাম ও সাহেববাজারের জুতা ব্যবসায়ী আমজাদ বলেন, ফুটপাতে কম দামে পণ্য মেলায় মার্কেটের ক্রেতা কমে গেছে। ফুটপাতে জামা দেখছিলেন বাধন নামের এক তরুণ। তিনি জানান, মার্কেটের তুলনায় ফুটপাতে কাপড়ের দাম অনেক কম এবং মানও মোটামুটি ভালো।
ব্র্যান্ড শোরুমগুলোতেও বিক্রি কমেছে। ‘ইজি ফ্যাশন’-এর নাবিল মোস্তফা জানান, অনেকে অনলাইনে কেনাকাটা সারছেন, ফলে শো-রুমে ক্রেতার চাপ কমেছে।
জেনারেটরের বাড়তি ব্যয় ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
বিদ্যুৎ না থাকলে ক্রেতা ধরে রাখতে অনেক দোকানে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। ব্যবসায়ী আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, জেনারেটরের ডিজেলের বাড়তি খরচে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
এ বিষয়ে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (উপসচিব) রেজাউল করিম বলেন, "বিষয়টি জেলা প্রশাসন ও নেসকো দেখবে। তবে ব্যবসায়ীরা সিটি করপোরেশনে লিখিত আবেদন দিলে তা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা হবে।"
নেসকোর নির্বাহী পরিচালক (অপারেশন) মখলেসুর রহমান বলেন, "সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী সরবরাহ চলছে। মূলত সন্ধ্যার পর মার্কেটগুলোতে লোডশেডিং হওয়ার কথা নয়। বিষয়টি আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছি।"
পরিকল্পিত রেশনিংয়ের তাগিদ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহা. ফরিদ উদ্দীন খান বলেন, "উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকট যুক্ত হয়ে ব্যবসাকে স্থবির করে দিয়েছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ও পর্যাপ্ত আলো ছাড়া মানুষ এখন মার্কেটে যেতে চান না।"
স্বল্পমেয়াদি সমাধান হিসেবে তিনি পরিকল্পিত রেশনিংয়ের পরামর্শ দিয়ে বলেন, "কোন এলাকায় কখন বিদ্যুৎ থাকবে না, তা আগে জানালে ব্যবসায়ীরা প্রস্তুতি নিতে পারবেন। তবে দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতেই হবে। তৃণমূলের এই ছোট উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।"
ডিআর




Comments