Image description

একটি ডিও লেটার। লিখেছিলেন আওয়ামী লীগের সবশেষ শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন। আর সেটিই 'আলাদিনের চেরাগ' ছিল নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা মো. সফিকুর রহমানের কাছে। বাগিয়ে নিয়েছিলেন ঢাকা রেলওয়ের বিভাগীয় ব্যবস্থাপকের (ডিআরএম) পদ। গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েই হয়ে ওঠেন স্বৈরাচারী। কর্মচারীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, ফাইল আটকে রাখা—এসবই হয়ে ওঠে তার 'রুটিন ওয়ার্ক'।

২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের পর খোলস পাল্টে ফেলেন সফিকুর। রাতারাতি সাজেন বিএনপিপন্থী। এই পরিচয় নিয়েই ডিআরএম পদে মেয়াদ পূর্ণ করেন তিনি। এরপর পেয়ে যান আরেকটি পদোন্নতি। তবে সক্রিয় ফ্যাসিবাদের দোসর কীভাবে জুলাই বিপ্লবের পর শাস্তির বদলে উল্টো পদোন্নতি পেলো—তা নিয়ে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে জুলাই আন্দোলনের পক্ষের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনে।

আওয়ামী লীগ মন্ত্রীর ডিও লেটারে পদোন্নতি

বর্তমানে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চীফ অপারেটিং সুপারিন্টেন্ডেন্ট (সিওপিএস) এর দায়িত্ব পালন করা মোহাম্মদ সফিকুর রহমান নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সদস্য। ছাত্র জীবনে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন।

২০২২ সালের ২৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সরকারের সবশেষ শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন সফিকুরের জন্য একটি ডিও লেটার দেন। ওই চিঠিতে সফিকুর রহমানকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের 'ছাত্রলীগ সক্রিয় কর্মী' হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এছাড়াও তার পিতা নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের সক্রিয় সদস্য—সেটিও উল্লেখ আছে চিঠিতে। সফিকুরের পরিবারের সদস্যরা রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত—এমন দাবিও করা হয়েছে।

ওই চিঠির পর কপাল খুলে যায় সফিকুরের। একমাস পর সফিকুর রহমান ঢাকা রেলওয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদ বিভাগীয় ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) পদে পদোন্নতি পান।

যেভাবে ভোল পাল্টে বিএনপি

সফিকুরের ডিআরএম পদের মেয়াদ যেন নির্বিঘ্নে শেষ হয় তার জন্য রেলের তৎকালীন মহাপরিচালক সরদার সাহাদাত আলীর কাছে একাধিকবার তদবির করেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও নরসিংদীর খায়রুল কবির খোকন। এভাবেই ছাত্রলীগ নেতা থেকে পুরোদস্তুর বিএনপি বনে যান সফিকুর। এরপর তাকে দেওয়া হয় অতিরিক্ত প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তার দায়িত্ব।

তবে বারবার রাজনৈতিক রূপ বদলানো নিয়ে ক্ষুব্ধ ছিলেন রেলের বিএনপি-জামায়াতপন্থী কর্মকর্তাদের একাংশ। এরই জেরে ২০২৫ সালের ১৭ এপ্রিল সফিকুরকে রেলভবনে জনসংযোগ পরিচালক পদে সরানো হয়। যেটি তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ।

তবে 'অদৃশ্য জাদুতে' কিছুদিনের মধ্যেই ফেরেন আরও বড় দায়িত্বে—রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চীফ অপারেটিং সুপারিন্টেন্ডেন্ট (সিওপিএস)। এখন তার হাতেই ঢাকা ও চট্টগ্রাম রুটের ট্রেন চলাচলের নিয়ন্ত্রণ।

কামরা ফাঁকা রেখেই ছেড়ে দেন ট্রেন

সফিকুর রহমানের শুরুটা হয়েছিল ঢাকা অঞ্চলের টিকিট ব্যবসার নিয়ন্ত্রক পদ ডিসিও দিয়ে। সেই পদেই মেলে তার স্বেচ্ছাচারিতার প্রথম নজির। ২০২২ সালের আগে ঈদের ছুটিতে পুরো এক কামরা ফাঁকা রেখেই তিনি ছেড়ে দেন ট্রেন।

ঈদের সময় যেখানে ঘরমুখো মানুষের ভিড়ে টিকিটের জন্য চলে হাহাকার, সেই সংকটের মধ্যেই সফিকুর রহমানের এই কাণ্ড তখন ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয় রেলের অভ্যন্তরে। তবে ক্ষমতার প্রভাবে সেই সমালোচনা বেশি দূর গড়ায়নি বলেই মত রেলের একাধিক কর্মকর্তার।

বেয়ারাকে বানিয়েছেন গৃহকর্মী

পাবনার ঈশ্বরদী স্টেশনের বেয়ারা জরিনা বেগমকে চার বছর ধরে বানিয়ে ফেলেন নিজের ঘরের গৃহকর্মী। বছরের পর বছর রেলের এই কর্মচারীকে দিয়ে করান ঢাকার বাসার কাজ। ক্ষমতার দাপটে ঘটনাটি চাপা পড়ে যায় বছরের পর বছর।

ফাইল আটকে রেখে স্বেচ্ছাচারী

ট্রেন চলাচলে গতি আনতে গত ২৩ আগস্ট ৫২৫ জন গেটকিপারকে পয়েন্টসম্যান পদে পদোন্নতি দেয় রেলওয়ে। অথচ সফিকুর সেই ফাইল অনুমোদন করেন দেড় মাস পর। একই আদেশ পাকশী ও লালমনিরহাটে কার্যকর হয়ে যায় আগেই।

একইভাবে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি স্টেশন মাস্টারদের গ্রেড ৪ থেকে গ্রেড ৩-এ পদোন্নতির ফাইলও তিনি অনুমোদন করেন চার মাস পর, গত ১৮ জুন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মচারীর ভাষ্য, আওয়ামী লীগ ঘরানার রাজনৈতিক পরিচয়ের কেউ ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ রুটের ট্রেন চলাচল প্রধানের পদে থাকাটাই প্রশ্নবিদ্ধ। ফাইল অনুমোদনে ধীরগতি ও কর্মচারীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার নিয়েও ক্ষোভ জানান তারা।

কর্তৃপক্ষের যা বলছেন

এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মামুনুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ব্যস্ততা দেখান। পরবর্তীতে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়ে মন্তব্য চাওয়া হলেও তার কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, পূর্বাঞ্চলের চিফ অপারেটিং সুপারিন্টেন্ডেন্ট (সিওপিএস) মোহাম্মদ সফিকুর রহমান বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক শিল্পমন্ত্রীর মাধ্যমে দেওয়া কোনো আধা-সরকারি পত্রের (ডিও লেটার) তথ্য তার জানা নেই।’

কর্মচারীদের দিনভর অফিসের সামনে দাঁড় করিয়ে রাখার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কোনো কর্মচারীকে ‘বুক অফ’ করার অর্থ হলো নির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে তাকে অফিসে তলব করা। ওই দিন সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর কোনো ডিউটি থাকে না। আমি সুবিধাজনক সময়ে তাদের কথা ও অভিযোগ শুনে থাকি।’

ডিআর