হালুয়াঘাটে দুই মৎস্য প্রকল্পে ৯২ লাখ টাকার ভূমি উন্নয়ন কর বকেয়া
হালুয়াঘাট (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি
ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার স্বদেশী ইউনিয়নে অবস্থিত দুটি বাণিজ্যিক মৎস্য প্রকল্পের নামে ৯২ লাখ ২২ হাজার ৪০৫ টাকা ভূমি উন্নয়ন কর বকেয়া রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই কর পরিশোধ না করায় সরকারি রাজস্ব বকেয়া পড়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস। বকেয়া আদায়ে ইতোমধ্যে প্রকল্প দুটির সংশ্লিষ্টদের নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
উপজেলার ১২ নম্বর স্বদেশী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত বাউশী ফিশারিজ প্রজেক্ট লিমিটেড ও নাগলা ফিশারিজ প্রজেক্ট লিমিটেডের নামে এই বকেয়া রয়েছে। গত ১৫ সেপ্টেম্বর স্বদেশী ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে পৃথক নোটিশ জারি করা হয়। নোটিশে সাত দিনের মধ্যে বকেয়া করের পাশাপাশি হাল সনের ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নোটিশে আরও বলা হয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বকেয়া পরিশোধ না করলে সরকারি পাওনা আদায় আইন, ১৯১৩ অনুযায়ী সার্টিফিকেট মামলা দায়েরসহ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্বদেশী ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, মৎস্য প্রকল্প দুটির আওতায় প্রায় ১০২ দশমিক ০৩ একর জমি রয়েছে। জমিগুলোর শ্রেণি ‘পুকুর’ এবং ব্যবহার বাণিজ্যিক হওয়ায় সে অনুযায়ী ভূমি উন্নয়ন কর নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর মধ্যে স্বদেশী মৌজায় প্রায় ৬৯ একর জমির বিপরীতে ৮৫ লাখ ১৫ হাজার ৬৯৩ টাকা এবং মাছাইল মৌজার ৬৭০ ও ৬৭১ নম্বর খতিয়ানে থাকা ৭ দশমিক ৬৪৫ একর জমির বিপরীতে ৭ লাখ ৬ হাজার ৮১০ টাকা বকেয়া রয়েছে। বকেয়া ও হাল সনের করসহ মোট পাওনার পরিমাণ ৯২ লাখ ২২ হাজার ৪০৫ টাকা বলে ভূমি অফিসের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
ভূমি অফিস সূত্র জানায়, অনলাইনভিত্তিক ভূমি উন্নয়ন কর ব্যবস্থা চালুর আগে ২০১০ সালে হাতে-কলমে আংশিক কর পরিশোধ করা হয়েছিল। এরপর নিয়মিত কর পরিশোধ না করায় ধীরে ধীরে বড় অঙ্কের বকেয়া তৈরি হয়েছে।
প্রকল্পের জমিদাতা বুরুজ আলী জানান, ঢাকার মতিঝিলের রাসেল, ঢাকার ফারুক, জামালপুরের গালিব ও বাবুলসহ কয়েকজন ব্যক্তি মো. শফিকুর রহমানের সহযোগিতায় ২০০৩ সালের দিকে প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁর কাছ থেকে প্রকল্পের জন্য ৮৩ শতাংশ জমি কেনা হয়েছিল বলেও তিনি জানান।
বুরুজ আলীর ভাষ্য, শুরুতে প্রায় ৬ একর জমি নিয়ে ফিশারিজ প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হয়। পরে তা নাগলা ও বাউশী লিমিটেড নামে সম্প্রসারিত হয়।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১১ নম্বর আমতৈল ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান মো. শফিকুর রহমান (শফিক)-এর তত্ত্বাবধানে প্রকল্পটির কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে বলে স্থানীয়দের দাবি। প্রকল্প এলাকায় কর্মচারীদের মাছের খামার পরিচর্যার কাজ করতেও দেখা গেছে।
স্থানীয়দের আরও দাবি, চেয়ারম্যানের বড় ভাইয়ের ছেলে চঞ্চল মিয়া এবং তাঁর ম্যানেজার নয়ন প্রকল্পের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত থেকে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। স্থানীয় নুরুল আমিন জানান, চেয়ারম্যানের কাছ থেকে পাঁচ বছরের জন্য এক কোটি টাকা ভাড়ায় প্রকল্পের একটি অংশ পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রায় ১০২ একর জমির অর্ধেক অন্যান্য মালিকদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
তবে প্রকল্পের মালিকানা ও তত্ত্বাবধানের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইউপি চেয়ারম্যান মো. শফিকুর রহমান (শফিক)। তিনি বলেন, একটি মহল তাঁকে হেয় করার উদ্দেশ্যে এসব কথা ছড়াচ্ছে। ফিশারিজ প্রকল্পের মালিক তিনি নন; এটি একটি লিমিটেড কোম্পানির মালিকানাধীন।
চেয়ারম্যানের দাবি, ২০০৩ সালের দিকে দুটি ফিশারিজ প্রতিষ্ঠিত হলেও তিনি কেবল ওই সময় দায়িত্বে ছিলেন। ২০১০ সালে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি প্রকল্পটির সঙ্গে সরে দাঁড়ান এবং প্রয়োজন ছাড়া সেখানে যান না। তাঁর সময়ে সব ধরনের কর পরিশোধ করা হয়েছিল বলেও তিনি দাবি করেন।
স্বদেশী ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা মো. সালাহ্ উদ্দিন রাসেল জানান, দাপ্তরিক নথিতে প্রকল্প দুটির মালিক হিসেবে কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ নেই; সেখানে দুজন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কথা রয়েছে।
তিনি বলেন, বকেয়া কর আদায়ের জন্য এর আগে ২০২৫ সালের ৯ নভেম্বর সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর নির্দেশে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। ঢাকার সেগুনবাগিচা ঠিকানাতেও নোটিশ পাঠানো হয়। সর্বশেষ ১৫ সেপ্টেম্বর সাত দিনের মধ্যে বকেয়া কর পরিশোধের নির্দেশ দিয়ে নতুন করে নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বকেয়া রাজস্ব পরিশোধ করা না হলে আইন অনুযায়ী সার্টিফিকেট মামলাসহ পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জাকিয়া সুলতানা রোজী বলেন, সংশ্লিষ্ট জমিতে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। বকেয়া ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের লক্ষ্যে একটি পিডিআর মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
এসএ




Comments