Image description

গাইবান্ধার একমাত্র বক্ষব্যাধি ক্লিনিক। সকাল সাড়ে ১০টা। শহরের যক্ষ্মারোগ চিকিৎসাকেন্দ্র তথা বক্ষব্যাধি ক্লিনিকের বারান্দায় চুপচাপ বসে আছেন ৮০ বছর বয়সী আমিনা বেগম। বুকের কফজনিত সমস্যা নিয়ে সদর উপজেলার পূর্বপাড়া থেকে এসেছেন তিনি। পরীক্ষার জন্য কফের নমুনা দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু ফল পজিটিভ এলে চিকিৎসা নেবেন কার কাছে—এই দুশ্চিন্তায় অস্থির তিনি। কারণ, ক্লিনিকটিতে নেই কোনো যক্ষ্মারোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।

শুধু আমিনা বেগম নন, প্রতিদিন এমন অনিশ্চয়তা আর হতাশা নিয়েই গাইবান্ধার একমাত্র এই বক্ষব্যাধি ক্লিনিকে আসা ২০ থেকে ৩০ জন রোগীকে ফিরে যেতে হচ্ছে।

জেলার একমাত্র এই বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরেই জনবল সংকটে ভুগছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চিকিৎসকশূন্যতা, ওষুধ সরবরাহ বন্ধ থাকা এবং কর্মীদের বেতন আটকে থাকার মতো একের পর এক জটিলতা। রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সকালে সরেজমিনে গিয়ে উঠে এসেছে প্রতিষ্ঠানটির এমনই বেহাল চিত্র।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, যক্ষ্মারোগ চিকিৎসাগার (বক্ষব্যাধি ক্লিনিক)–এ অনুমোদিত পদ রয়েছে মোট ১৭টি। এর বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৯ জন। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক পদই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। ২০২২ সাল থেকে খালি রয়েছে মেডিকেল অফিসারের পদ। চলতি বছরের ১৯ জুলাই থেকে শূন্য হয়েছে জুনিয়র কনসালট্যান্টের পদও। ফলে বর্তমানে ক্লিনিকটিতে দায়িত্ব পালনের মতো কোনো চিকিৎসক নেই।

চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি গত ১৬ বছর ধরে এখানে অফিস সহকারী, সহকারী নার্স ও গৃহপরিদর্শিকার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদেও জনবল নেই। নেই কোনো পরিচ্ছন্নতাকর্মীও। দীর্ঘদিনের এই জনবল সংকটে প্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক কার্যক্রম প্রায় ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

ক্লিনিকের কর্মচারীরা জানান, নিয়ম অনুযায়ী এখানে একজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট, একজন মেডিকেল অফিসার ও দুজন সহকারী নার্স থাকার কথা। কিন্তু বর্তমানে এসব পদে কেউ কর্মরত নেই। ফলে রোগীদের ওষুধ লিখবেন কে—এটাই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে নতুন করে কোনো ওষুধ বরাদ্দ বা সংগ্রহ না হওয়ায় গত প্রায় দুই মাস ধরে ক্লিনিকটিতে ওষুধ সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।

শুধু ওষুধ নয়, প্রয়োজনীয় ফিল্মের অভাবে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে এক্স-রে মেশিনও। বর্তমানে কফ পরীক্ষা ছাড়া প্যাথলজির আর কোনো পরীক্ষা করার সুযোগ নেই এই ক্লিনিকে।

সরেজমিনে ক্লিনিকটিতে গিয়ে রোগীদের ভোগান্তির চিত্র দেখা যায়। কর্মচারীরা দাফতরিক কাজে ব্যস্ত থাকলেও অনেকে অলস সময় কাটাচ্ছেন। বাইরে থেকে একের পর এক রোগী এলেও চিকিৎসকের দেখা মিলছে না। শেষ পর্যন্ত সেবা না পেয়েই অনেককে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে দেখা যায়।

ফুলছড়ি গ্রামের বাসিন্দা আমজাদ মিয়া বলেন, “পরপর দুই দিন ডাক্তার দেখাতে এসেছি। কিন্তু কোনো ডাক্তারের দেখা পাইনি। দুজন ডাক্তার থাকার কথা, অথচ একজনও নেই। ডাক্তার থাকলে আমাদের এই সমস্যা হতো না।” দ্রুত একজন যক্ষ্মারোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগের দাবি জানান তিনি।

গাইবান্ধা পৌর শহরের সুন্দরজাহান মোড়ের বাসিন্দা আনোয়ার মিয়া বলেন, আগে এই ক্লিনিক থেকে ওষুধ পাওয়া যেত। কিন্তু প্রায় দুই মাস ধরে তিনি কোনো ওষুধ পাচ্ছেন না।

গাইবান্ধা সদর উপজেলার দক্ষিণ ধানঘড়া গ্রামের বাকী মিয়া বলেন, “রোগ হলেই আসতাম, ওষুধ খেলে সেরে যেত। এখন এসে শুধু ঘুরেই যাই। ডাক্তারও নেই, ওষুধও নেই।”

একই অভিজ্ঞতার কথা জানান পলাশবাড়ীর ঘোড়াবান্ধা এলাকার রফিক মিয়া। তিনি বলেন, আগে চিকিৎসার জন্য এই ক্লিনিকেই আসতেন। কিন্তু এখন যেদিনই যান, কর্মচারী ছাড়া আর কাউকে পাওয়া যায় না।

চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে আছে ক্লিনিকের কর্মরতদের বেতনও। বিষয়টি জানিয়ে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে দুই দফা চিঠি পাঠানো হলেও এখনো কোনো সমাধান হয়নি।

জেলা সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক)-এর সভাপতি আফরোজা বেগম বলেন, পুরোনো ও জরাজীর্ণ ভবনেই চলছে চিকিৎসাসেবা। অথচ দিন দিন বাড়ছে মানুষের সংখ্যা। মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে অন্তত একজন যক্ষ্মারোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, একজন মেডিকেল অফিসার, প্রয়োজনীয় সংখ্যক নার্স ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগের পাশাপাশি নতুন ও আধুনিক ভবন নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গাইবান্ধার সিভিল সার্জন ডা. রফিকুজ্জামান বলেন, ক্লিনিকের দায়িত্ব সামলাতে ইতোমধ্যে একজনকে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে প্রশাসনিক কিছু কাজ এখনো আটকে আছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠির মাধ্যমে জানানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া বা সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।

দীর্ঘদিনের এই সংকট কবে কাটবে গাইবান্ধার একমাত্র বক্ষব্যাধি ক্লিনিকে, কবে স্বাভাবিক হবে চিকিৎসাসেবা—তার সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনো নেই। ফলে চিকিৎসাসেবার আশায় ক্লিনিকটিতে আসা সাধারণ রোগীদের ভোগান্তিও দিন দিন বাড়ছে।

এসএ