রাজস্ব আয়ে নতুন সাফল্য দেখিয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলা। দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্র বন্দর হিসেবে মোংলা বন্দর দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতি তথা সমগ্র বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব রেখে চলেছে। বর্তমান সরকারের শাসনামলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর বন্দরের উন্নয়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে উন্নয়নমূলক কাজ করে যাচ্ছেন। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের অব্যবহিত পরই নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম মোংলা বন্দর পরিদর্শনপূর্বক বন্দরের সার্বিক উন্নয়ন ও মোংলা বন্দরের কার্যক্রমে গতিশীলতা আনয়নের বিষয়ে নির্দেশনা প্রদান করেন।
মন্ত্রী মহোদয়ের যুগোপযোগী নির্দেশনার প্রেক্ষিতে মোংলা বন্দরের কর্মচাঞ্চল্য যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। সরকার ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পাশাপাশি মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা, তাঁর পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা ও সুদূরপ্রসারী দূরদর্শিতাকে কাজে লাগিয়ে বন্দর ব্যবহারকারী, স্টেকহোল্ডার, শিপিং এজেন্টস, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, স্টিভেডরসহ সব ধরণের ব্যবসায়ীদের সাথে নিয়মিত মতবিনিময় ও বৈঠক করছেন।
বন্দরের প্রাণ জাহাজ আগমনের সংখ্যা বৃদ্ধির লক্ষ্যে 'Internal Business Development Standing Committee' গঠনের মাধ্যমে জাহাজের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া বন্দরের নিবেদিতপ্রাণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্পৃহা বৃদ্ধি ও গতিশীলতা আনয়নের লক্ষ্যে চেয়ারম্যান মহোদয় সংশ্লিষ্ট সকল বিভাগের সাথে নিয়মিত সভা আহ্বানের মাধ্যমে বন্দরের উন্নয়ন ও গৃহীত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে চলেছেন।
২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষে মোট ৮১৫টি জাহাজ আগমন হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বন্দরের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ শত ৮৭ কোটি ৯৫ লাখ ১২ হাজার টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি আয় করার পাশাপাশি আগের অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব বেড়েছে ৪০ কোটি ৮২ লাখ ৬৪ হাজার টাকা, যা শতাংশের হিসাবে ১১.৭৬ শতাংশ বৃদ্ধি।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টায় মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের অডিটরিয়ামে বাগেরহাট ও মোংলা প্রেসক্লাবের সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বন্দরের সাম্প্রতিক অগ্রগতি ও এসব তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরা হয়। সংবাদের তথ্য অনুযায়ী, শুধু রাজস্ব আয় নয়; জাহাজ আগমন, কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়েও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
এ সময়ে কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯১ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন। এর বিপরীতে ১ কোটি ২২ লাখ ৫১ হাজার মেট্রিক টন কার্গো হ্যান্ডলিং হয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় কার্গো হ্যান্ডলিং বেড়েছে ১৮ লাখ ৩৯ হাজার মেট্রিক টন বা ১৭.৬৬ শতাংশ।
কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়েও বেড়েছে ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্য। উক্ত অর্থবছরে ২৫ হাজার টিইইউজ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ২৯ হাজার ৭১৪ টিইইউজ কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ প্রবৃদ্ধি ৮ হাজার ২৫৮ টিইইউজ বা ৩৮.৪৯ শতাংশ।
এদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোংলা বন্দর দিয়ে ১২ হাজার ৭৫টি রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি হয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ সংখ্যা বেড়েছে ৪৯৬টি।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মোংলা বন্দরের বার্ষিক জাহাজ হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ১ হাজার ৫০০টি, কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ১ কোটি ৫০ লাখ মেট্রিক টন, কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ১ লাখ টিইইউজ এবং গাড়ি হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ২০ হাজার ইউনিট।
বন্দরের সক্ষমতা আরও বাড়াতে বর্তমানে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সহায়ক জলযান সংগ্রহ, মোংলা বন্দরের আপগ্রেডেশন এবং কনটেইনার টার্মিনাল ও ইয়ার্ড নির্মাণের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত কার্যক্রম।
সহায়ক জলযান সংগ্রহ প্রকল্পের আওতায় দুটি টাগবোট, একটি বয়া লেইং ভেসেল, একটি সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ ভেসেল, একটি পাইলট মাদার ভেসেল এবং একটি সার্ভে অ্যান্ড রিসার্চ ভেসেল সংগ্রহের কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে রয়েছে। প্রকল্পটি ২০২৭ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
অন্যদিকে ভারতীয় এলওসি-৩-এর অর্থায়নে ‘আপগ্রেডেশন অব মোংলা পোর্ট’ প্রকল্পের আওতায় আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ দুটি কনটেইনার টার্মিনাল, কনটেইনার হ্যান্ডলিং ইয়ার্ড ও ডেলিভারি ইয়ার্ড নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব অবকাঠামো বাস্তবায়িত হলে বন্দরকেন্দ্রিক শিপিং, সিঅ্যান্ডএফ, স্টিভেডরিং ও শ্রম খাতে নতুন কর্মসংস্থানের বড় সুযোগ তৈরি হবে।
এছাড়া মোংলা বন্দরে জাহাজ ও শিল্পকারখানা থেকে উৎপন্ন বর্জ্য সংগ্রহ এবং নিঃসৃত তেল অপসারণে আধুনিক ব্যবস্থাপনা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে এ প্রকল্পটি সফলভাবে শেষ হয়। এ ব্যবস্থার ফলে জাহাজের বর্জ্য নদী ও সমুদ্রে ফেলা বন্ধ করার পাশাপাশি পশুর চ্যানেল ও আশপাশের নদ-নদীর দূষণ কমানো এবং সুন্দরবনের পরিবেশ সুরক্ষায় বিশেষ সহায়তা মিলবে।
বর্তমানে বন্দরের সামনে অন্যতম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ১৪৪ কিলোমিটার দীর্ঘ চ্যানেলের নাব্যতা বৃদ্ধি করা ও তা ধরে রাখা। একই সঙ্গে নিরাপদ ও দূষণমুক্ত নৌপথ নিশ্চিত করা, পুরোনো সহায়ক জলযান প্রতিস্থাপন, নতুন জলযান সংগ্রহ, দক্ষ জনবল তৈরি এবং বন্দর ব্যবহারকারীদের আরও বেশি করে মোংলা বন্দর ব্যবহারে উৎসাহিত করার বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এর পাশাপাশি মোংলা বন্দরকে সরাসরি ‘ফার্স্ট কলিং পোর্ট’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা, কনটেইনারবাহী জাহাজের সংখ্যা বাড়ানো, সিঙ্গাপুরসহ গুরুত্বপূর্ণ বন্দরে সরাসরি ফিডার জাহাজ চলাচল এবং খুলনা-মোংলা ও খুলনা-ভাঙ্গা সড়ক যোগাযোগের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়েও জোর দিচ্ছে প্রশাসন।
চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা জানান, এসব বহুমুখী কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য হলো মোংলা বন্দরের সামগ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করার পাশাপাশি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও বেশি গতিশীল ও সমৃদ্ধ করা।
ডিআর




Comments