Image description

একসময় চট্টগ্রাম জেলার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগ্রহণের একমাত্র প্রতিষ্ঠান ছিল লোহাগাড়ার ‘সমন্বিত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষা কার্যক্রম’ বিদ্যালয়। কিন্তু প্রায় তিন বছর ধরে বিদ্যালয়টি বন্ধ থাকায় চট্টগ্রামসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

জেলার একমাত্র প্রতিষ্ঠান হওয়ায় লোহাগাড়া, সাতকানিয়া, বাঁশখালী, হাটহাজারী, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা, এমনকি ঢাকা বিভাগের কয়েকটি জেলা থেকেও শিক্ষার্থীরা এখানে পড়তে আসত। এ পর্যন্ত প্রায় ৪০ জন শিক্ষার্থী বিদ্যালয়টিতে ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে ২২ জন এসএসসি পাস করেছে এবং ২১ জন বিভিন্ন দপ্তরে পুনর্বাসিত হয়ে বর্তমানে স্বাবলম্বী জীবনযাপন করছেন বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, শিক্ষক ও কর্মচারীর সংকটে পড়ে বিদ্যালয়টির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। লোহাগাড়া উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের অধীনে ২০০০ সাল থেকে বিদ্যালয়টিতে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। এখানে শিক্ষার্থীদের ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়ানো হতো। পড়াশোনা শেষে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ পেয়ে অনেকেই স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পান।

প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে মাসে ৫ হাজার টাকা বরাদ্দ রয়েছে। তবে বিদ্যালয়টি চালু না থাকায় সেই অর্থ শিক্ষার্থীদের পেছনে ব্যয় করা সম্ভব হচ্ছে না এবং বরাদ্দের অর্থ ফেরত পাঠাতে হচ্ছে। প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ থাকার পরও বিদ্যালয়ের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টরা।

বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা যায়, লোহাগাড়া শাহপীর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিজস্ব ভবনে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টির মূল ফটকে তালা ঝুলছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় ভেতরে থাকা আসবাবপত্র ও শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সামগ্রী নষ্ট হচ্ছে। ১০ জন শিক্ষার্থীর আবাসন সুবিধাসংবলিত এই আবাসিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণি থেকে এসএসসি পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিনামূল্যে থাকা, খাওয়া ও পড়াশোনার সুযোগ ছিল।

বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী নরসিংদীর বাসিন্দা শিহাব উদ্দিন ভূঁইয়া জানান, তিনি ২০১৫ সালে এই বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন।

তিনি বলেন, “দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য এমন স্কুল অত্যন্ত জরুরি। ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়ালেখা শেষ করা যোগ্য দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের এখানে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিলেই এই সংকট দূর করা সম্ভব। এতে তাঁদের কর্মসংস্থানেরও সুযোগ তৈরি হবে।”

আরেক প্রাক্তন শিক্ষার্থী মাদারীপুরের সুমন আহমেদ চৌধুরী জানান, তিনি এই বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করে বর্তমানে ঢাকার দোহার উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে ইউনিয়ন সমাজকর্মী হিসেবে কর্মরত আছেন। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জীবনে আলোর পথ দেখাতে বিদ্যালয়টির ভূমিকা অনন্য বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

লোহাগাড়া উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রিদুয়ানুল করিম জানান, টানা ২৩ বছর চালু থাকা বিদ্যালয়টিতে দুজন শিক্ষক, একজন বাবুর্চি ও একজন নিরাপত্তা প্রহরীর পদ রয়েছে। বর্তমানে সবগুলো পদই শূন্য। বিশেষ পঠন-পদ্ধতির এই বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে বিদ্যালয়টি পুনরায় চালুর বিষয়ে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়েছে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক শহীদুল ইসলাম বলেন, “আমি নিজে বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেছি। অর্থ বরাদ্দ থাকলেও মূলত জনবলের অভাবেই এটি বন্ধ রয়েছে। এখানে সরকারি অর্থ নয়ছয় করার সুযোগ নেই। শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল জরুরি। বিষয়টি ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়, সচিব ও ডিজিকে জানানো হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে শিক্ষক নিয়োগ সম্পন্ন করে জানুয়ারিতে বিদ্যালয়টি পুনরায় চালুর চেষ্টা চলছে।”

এসএ