স্বাস্থ্য সহকারী হয়েও ‘ক্ষমতার বলয়ে’, বাতিল আদেশ ঝুলছে হাইকোর্টে
নিয়োগ স্বাস্থ্য সহকারী হিসেবে। মূল কর্মস্থল চট্টগ্রামের বাইরের উপজেলায়। অথচ ‘নিজ বেতনে’ অন্য পদে দায়িত্ব পালনের পর ঠাঁই হয়েছে চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ে। অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের একজন সিভিল সার্জনের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ) ও প্রটোকল কর্মকর্তার মতো দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যজনের হাতে রয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বাস্থ্য সনদসহ গুরুত্বপূর্ণ নথির ফাইল।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এসব পদায়ন, পদোন্নতি ও সংযুক্তির আদেশ বাতিল করলেও তা কার্যকর হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ দ্বারস্থ হয়েছেন হাইকোর্টের। এতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন আটকে যাওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্য বিভাগের পদায়ন ব্যবস্থাপনা, দায়িত্ব বণ্টন ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মূল কর্মস্থল বাইরে, গন্তব্য চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়
পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য সহকারী প্রবীর মিত্র। নথি অনুযায়ী, তিনি ‘নিজ বেতনে’ হেলথ এডুকেটর হিসেবে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করেছেন। স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরোর একটি অফিস আদেশেও তাঁর মূল পদ ও পূর্বের দায়িত্বের তথ্য উল্লেখ রয়েছে।
অন্যদিকে কাজী মাসুদুল আলমের মূল কর্মস্থল ফেনীর পরশুরাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। তিনিও ‘নিজ বেতনে’ হেলথ এডুকেটর হিসেবে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে দায়িত্ব পালনের পর চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ে সংযুক্ত হন।
অর্থাৎ, দুজনের মূল কর্মস্থল চট্টগ্রামের বাইরে হলেও বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালনের পর তাঁদের অবস্থান হয় চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ে। তাঁদের পদায়ন, সংযুক্তি ও দায়িত্ব পালনের প্রশাসনিক অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট বিধি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের একাংশ।
স্বাস্থ্য সহকারী প্রবীরের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন
প্রবীর মিত্রকে ঘিরে অভিযোগ, তিনি চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ে সিভিল সার্জনের ব্যক্তিগত সহকারী ও প্রটোকল কর্মকর্তার মতো দায়িত্ব পালন করছেন। প্রশিক্ষণসংক্রান্ত ফাইলসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক নথির সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
তবে চট্টগ্রাম স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি জানিয়েছেন, সিভিল সার্জন কার্যালয়ে ‘পিএ-প্রটোকল অফিসার’ নামে কোনো পদ নেই। কাউকে এ ধরনের দায়িত্বে নেওয়ার আদেশও হয়নি। স্বাস্থ্য সহকারীদের মধ্য থেকে সরাসরি কাউকে সিভিল সার্জনের প্রটোকলের দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ নেই বলেও জানান তিনি।
মাসুদের কাছে স্বাস্থ্য সনদের ফাইল
কাজী মাসুদুল আলমের বিরুদ্ধেও গুরুত্বপূর্ণ নথি ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বাস্থ্য সনদসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফাইল তাঁর নিয়ন্ত্রণে থাকে।
স্বাস্থ্য সহকারী পদে নিয়োগপ্রাপ্ত একজন কর্মচারী কীভাবে এসব নথির দায়িত্ব পেলেন, তাঁর দায়িত্বের লিখিত অনুমোদন রয়েছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে নির্ধারিত বিধি অনুসরণ করা হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে স্পষ্টতা চেয়েছেন স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা।
করোনাকালের সংযুক্তি নিয়ে প্রশ্ন
প্রবীর মিত্র ও কাজী মাসুদুল আলমের বর্তমান অবস্থানের পেছনে করোনাকালীন সংযুক্তির বিষয়টিও সামনে এসেছে। মহামারির সময় জরুরি স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনে বিভিন্ন হাসপাতাল ও দপ্তরে জনবল সংযুক্ত করা হয়েছিল।
সংশ্লিষ্ট নথিতে তাঁদের সংযুক্ত কর্মস্থল থেকে অবমুক্ত করে মূল কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়ার তথ্য রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ে তাঁদের দায়িত্ব পালনের প্রশাসনিক অনুমোদন ও সংযুক্তির ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বাতিল আদেশের বিরুদ্ধে একের পর এক রিট
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন পদায়ন, পদোন্নতি ও সংযুক্তির আদেশ বাতিলের বিরুদ্ধে একাধিক রিট হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। নথি অনুযায়ী, মো. নাছির উদ্দিন, কাজী মাসুদুল আলম, প্রবীর মিত্র ও সম্পদ দের পদায়ন, পদোন্নতি ও সংযুক্তি বাতিল করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর বিরুদ্ধে চারজনই হাইকোর্টে রিট করেন।
এ ছাড়া মো. রিয়াজ উদ্দিন, টিটুকান্তি পাল, মো. সৈয়দ আকবর, ওমর ফারুক ও মমতাজ উদ্দিন অধিদপ্তরের আদেশের বিরুদ্ধে রিট করেছেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। জহরলাল পাল নামের আরেক স্বাস্থ্য সহকারীও রিট করেছেন।
দুই জন্মনিবন্ধনে ভিন্ন স্থায়ী ঠিকানা
চট্টগ্রাম জেলা স্বাস্থ্য তত্ত্বাবধায়ক সুজন বড়ুয়াকে ঘিরেও অভিযোগ রয়েছে। বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দুটি স্থায়ী ঠিকানা ব্যবহার করে পৃথক জন্মনিবন্ধন সনদ নেওয়া এবং ভিন্ন জেলার ঠিকানা ব্যবহার করে সরকারি চাকরি নেওয়ার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
তবে তদন্ত কার্যক্রম বন্ধের আবেদন জানিয়ে হাইকোর্টে রিট করেন সুজন বড়ুয়া। আদালত তদন্তের ওপর তিন মাসের স্থগিতাদেশ দেন এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ ১৯ জনকে রুলের জবাব দিতে বলেন।
পদায়ন ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন
স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরোর অফিস আদেশে নিয়োগবিধির বাইরে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করা স্বাস্থ্য সহকারীদের পদায়ন বাতিলের তথ্য রয়েছে। ওই তালিকায় প্রবীর মিত্র ও কাজী মাসুদুল আলমসহ একাধিক স্বাস্থ্য সহকারীর নাম রয়েছে বলে জানা গেছে।
একদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বিধির বাইরে পদায়ন ও সংযুক্তি বাতিলের উদ্যোগ নিয়েছে, অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ আদালতের আশ্রয় নিয়েছেন। ফলে প্রশাসনিক আদেশের বাস্তবায়ন, দায়িত্ব বণ্টনের স্বচ্ছতা এবং সংযুক্তির যৌক্তিকতা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রবীর মিত্র বলেন, ‘করোনাকালীন সময় থেকে আমি সিভিল সার্জন কার্যালয়ে ডেপুটেশনে কর্মরত আছি। দপ্তরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সেখানে দায়িত্ব পালন করছি।’ জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমানকে একাধিকবার মুঠোফোনে কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
চট্টগ্রাম স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ‘সিভিল সার্জন কার্যালয়ে পিএ-প্রটোকল অফিসার নামে কোনো পদ নেই। কাউকে এ ধরনের দায়িত্বে নেওয়ার আদেশও হয়নি। স্বাস্থ্য সহকারীদের মধ্য থেকে সরাসরি কাউকে সিভিল সার্জনের প্রটোকলের জন্য নেওয়ার সুযোগ নেই।’
চট্টগ্রাম জজকোর্টের সাবেক এপিপি ও মানবাধিকার সংগঠক অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আয়াত উল্লাহ বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগের পদায়ন, সংযুক্তি ও দায়িত্ব বণ্টনে বিধি অনুসরণ এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। আদালতের আশ্রয় নেওয়া নাগরিকের অধিকার। তবে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন ও তদন্ত কার্যক্রমের ক্ষেত্রে আদালতের আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট বিধি অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্ব বণ্টন ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
এসএ




Comments