ধামরাইয়ে ২৩ একর জমিতে কৃষি বিপ্লব, দুই তরুণ উদ্যোক্তার সাফল্যের নতুন দিগন্ত
চাকরির পেছনে না ছুটে কৃষিকে পেশা ও ব্যবসা হিসেবে বেছে নিয়ে সাফল্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ঢাকার ধামরাইয়ের দুই তরুণ উদ্যোক্তা সৌরভ আল লালন ও মো. ইয়ার হোসেন। মাত্র পাঁচ একর জমিতে মৎস্য চাষ দিয়ে যাত্রা শুরু করে ছয় বছরের ব্যবধানে তাঁরা গড়ে তুলেছেন ২৩ একরের সমন্বিত কৃষি খামার। মাছের পাশাপাশি ফল, সবজি ও গবাদিপশু পালনের মাধ্যমে কৃষিকে আধুনিক ও বাণিজ্যিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছেন তাঁরা।
ধামরাই উপজেলার সূয়াপুর ইউনিয়নের ললিত নগর এলাকায় গড়ে উঠেছে ‘ফার্মার’স জোন ফিস অ্যান্ড এগ্রো লিমিটেড’ নামের এ খামার। বর্তমানে খামারটিতে ১০ জন শ্রমিক নিয়মিত কাজ করছেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন দিন-রাত খামারের কাজে নিয়োজিত থাকেন। শ্রমিকদের বেতন বাবদ প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
খামারটির উদ্যোক্তা প্রকৌশলী সৌরভ আল লালন। শিক্ষা জীবন শেষে প্রচলিত চাকরির পথে না গিয়ে কৃষিতে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ২০২০ সালে নিজের পুঁজির সঙ্গে ধার করা অর্থ মিলিয়ে প্রায় ১৭ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে পাঁচ একর জমিতে মৎস্য খামার দিয়ে যাত্রা শুরু করেন। শুরুতে পাবদা মাছ চাষ করেন তিনি। প্রথম দফাতেই লাভজনক ফলাফল পাওয়ায় কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর উৎসাহ পান।
পরবর্তী সময়ে বন্ধু মো. ইয়ার হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে খামারের পরিধি বাড়াতে থাকেন তাঁরা। একপর্যায়ে মৎস্য চাষের পাশাপাশি জমির আইল ও পুকুরপাড়ে বিভিন্ন ধরনের সবজি ও ফল চাষ শুরু করেন। বর্তমানে ২৩ একর জমিতে মাছ, ফল ও সবজির সমন্বিত চাষ করছেন দুই উদ্যোক্তা।
সরেজমিনে দেখা যায়, খামারের বিভিন্ন পুকুরে নানা প্রজাতির মাছ চাষ করা হচ্ছে। পুকুরের আইল ও আশপাশের জমিতে আদা, তরমুজ, করলা, মিষ্টি কুমড়া, লাউ, মরিচ ও পেঁপেসহ বিভিন্ন সবজি চাষ করা হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন জাতের কলা। এর মধ্যে জিনাইন, সবরি, কাঁচকলা, বল সুন্দরী ও তাইওয়ানের পিং জাতের কলাও রয়েছে।
খামারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশগুলোর একটি হলো পুকুরের পানির ওপর মাচা তৈরি করে তরমুজের চাষ। মাচাজুড়ে ঝুলে থাকা শত শত তরমুজ দর্শনার্থীদেরও আকৃষ্ট করছে। উদ্যোক্তাদের দাবি, এ পদ্ধতিতে পুকুরের জমি ও পানির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে।
মৎস্য ও সবজি উৎপাদনের পাশাপাশি খামারে দেশীয় মুরগি পালনও করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে বড় আকারে গরুর খামার করার জন্য ঘর নির্মাণের কাজ চলছে। একই সঙ্গে হাঁস পালনেরও পরিকল্পনা রয়েছে। কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদকে একই ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে একটি পূর্ণাঙ্গ সমন্বিত খামার গড়ে তুলতে চান উদ্যোক্তারা।
খামারের ব্যবস্থাপক মো. শামীম হোসেন বলেন, “বর্তমানে খামারের পরিধি বৃদ্ধির কাজ চলছে। মৎস্য চাষের পাশাপাশি নানা ধরনের সবজি ও ফল উৎপাদন করা হচ্ছে। বর্তমানে ১০ জন শ্রমিক এখানে কাজ করছেন। গরুর খামারের জন্য ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে হাঁস পালনও শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “মালিকেরা সব সময় নতুন নতুন পরিকল্পনা করছেন। খামারের পরিধি বাড়ার সঙ্গে আরও শ্রমিক নিয়োগের পরিকল্পনাও রয়েছে। এখানে বিষমুক্ত সবজি ও মাছ উৎপাদনের চেষ্টা করা হচ্ছে।”
‘ফার্মার’স জোন ফিস অ্যান্ড এগ্রো লিমিটেড’-এর মালিক সৌরভ আল লালন বলেন, “২০২০ সালে মাত্র পাঁচ একর জায়গা নিয়ে নিজের পুঁজি ও ধার করা অর্থ মিলিয়ে প্রায় ১৭ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে মৎস্য চাষ শুরু করি। অনেকেই তখন নিরুৎসাহিত করেছিলেন। কিন্তু প্রথমে পাবদা মাছ চাষ করে সফলতা পাই। এরপর ধীরে ধীরে খামারের পরিধি বাড়াতে থাকি।”
তিনি বলেন, “ছয় বছরের মধ্যেই খামারটি বেড়ে ২৩ একরে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে এখানে ১০ জন মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা শ্রমিকদের বেতন দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করার পরিকল্পনা রয়েছে।”
তরুণ উদ্যোক্তা মো. ইয়ার হোসেন বলেন, “কৃষিকে শুধু জীবিকা হিসেবে না দেখে আধুনিক ও বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনা করার লক্ষ্য নিয়েই আমরা কাজ করছি। কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের সমন্বয়ে একটি আধুনিক কৃষি প্রকল্প হিসেবে খামারটিকে গড়ে তুলতে চাই। ধীরে ধীরে এর পরিধি আরও বাড়ানো হবে।”
ধামরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম বলেন, “বর্তমানে শিক্ষিত তরুণরা কৃষিতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হচ্ছেন। নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করার প্রবণতাও বাড়ছে। সূয়াপুর ইউনিয়নের ললিত নগর এলাকায় সৌরভ আল লালন ও ইয়ার হোসেন ২৩ একর জমিতে মৎস্য চাষের পাশাপাশি সমন্বিতভাবে ফল ও সবজি উৎপাদন করছেন।”
তিনি আরও বলেন, “খামারটিতে পুকুরের পানির ওপর মাচা তৈরি করে তরমুজ চাষ করা হয়েছে। পাশাপাশি লাউ, মরিচ, পেঁপে, মিষ্টি কুমড়া, করলা, পেয়ারা ও বিভিন্ন জাতের কলাসহ নানা ধরনের ফল ও সবজি উৎপাদন করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে গরু ও হাঁস পালনের পরিকল্পনাও রয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগ অন্য তরুণদেরও কৃষিতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে পারে।”
উদ্যোক্তাদের মতে, পরিকল্পিতভাবে কৃষিতে বিনিয়োগ ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করা গেলে কৃষি শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়, লাভজনক ব্যবসায়ও পরিণত হতে পারে। তাঁদের লক্ষ্য, খামারের পরিধি আরও বাড়িয়ে ভবিষ্যতে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের সমন্বয়ে একটি বড় কর্মসংস্থানমুখী কৃষি প্রকল্প গড়ে তোলা।
এসএ




Comments