Image description

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) উপাচার্য পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন এক সপ্তাহ পেরিয়েছে। সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থীদের শাটডাউনের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে কর্মবিরতিতে আছেন শিক্ষকরাও। বন্ধ রয়েছে ক্লাস-পরীক্ষা। তবে আন্দোলন যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই এর ভেতরে মতপার্থক্য ও অংশগ্রহণ কমে আসছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এখন উপাচার্য ইস্যুর পাশাপাশি নিজেদের ক্লাস-পরীক্ষা ও শিক্ষাজীবনের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন।

শুরুতে যে আন্দোলনে শিক্ষার্থীর ঢল, এখন কতজন?
আন্দোলনের শুরুতে শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ কর্মসূচিতে অংশ নিলেও পরে তাদের অনেকেই সরে এসেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিক্ষার্থীরা জানান, শুরুতে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন তারা। কিন্তু নতুন উপাচার্য নিয়োগের পর ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্দোলনের পদ্ধতি নিয়ে তাদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের দাবি, বর্তমানে ৩০ থেকে ৪০ জনের মতো শিক্ষার্থী সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে রয়েছেন। শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কমে যাওয়ার পর অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বহিরাগতদের আন্দোলনে যুক্ত করার অভিযোগও করেন তারা।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে অবশ্য নিয়মিত কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের কথা জানানো হচ্ছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে শাটডাউন, বিক্ষোভ, লাল কার্ড প্রদর্শন ও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন তারা।

বাড়ছে শিক্ষাজীবনের উদ্বেগ
আন্দোলনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে একাডেমিক কার্যক্রমে। ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকায় একাধিক বিভাগের পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের একটি অংশ আশঙ্কা করছে, অচলাবস্থা দীর্ঘ হলে সেশনজট তৈরি হতে পারে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শিক্ষার্থী বলেন, পরীক্ষার মাঝপথে আন্দোলন শুরু হওয়ায় তাদের পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে। হলগুলোতে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কমে যাওয়ায় ডাইনিং পরিচালনাতেও সংকট তৈরি হয়েছে।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে পুরকৌশল, যন্ত্রকৌশল, পেট্রোলিয়াম ও মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিংসহ কয়েকটি বিভাগের পরীক্ষা স্থগিত হওয়ার কথা এসেছে। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের বক্তব্য অনুযায়ী, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কর্মসূচির কারণে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

মতের অমিলেই অনলাইন গ্রুপ থেকে বাদ
আন্দোলনের বিরোধিতা বা মতের অমিলের কারণে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপ থেকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

গত মঙ্গলবার সকালে অন্তত ২০ শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপ থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ করেন কয়েকজন শিক্ষার্থী। হোয়াটসঅ্যাপের একটি তালিকায় পুরকৌশল, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল এবং যন্ত্রকৌশল বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থীর নাম রয়েছে।

চুয়েটের ২৪ ব্যাচের কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, আন্দোলনের সঙ্গে মতের অমিল হলেই শিক্ষার্থীদের সামাজিক ও অনলাইন পরিসরে চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। তাদের ভাষ্য, কোনো পক্ষের স্বার্থে দীর্ঘ সময় শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রাখা হলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিটা শিক্ষার্থীদেরই বহন করতে হবে।

আন্দোলনে কমেছে শিক্ষকদের অংশগ্রহণও
শিক্ষার্থীদের পর এবার আন্দোলনকারী শিক্ষকদের অংশগ্রহণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের ভাষ্য, শুরুতে ১৫৫ থেকে ১৭০ জন শিক্ষক কর্মসূচিতে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে সেই সংখ্যা ১২০ জনের নিচে নেমে এসেছে।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত একটি জুম বৈঠকের অডিওতে শিক্ষকদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়া নিয়ে আলোচনা শোনা যায়। সেখানে শুরুতে ১৫৫ জন, পরে ১৭০ জন শিক্ষক আন্দোলনে ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়। বৈঠকে বলা হয়, বর্তমানে সেই সংখ্যা ১২০ জনেরও কম এবং শুরুতে সক্রিয় থাকা অনেক শিক্ষক এখন আর কর্মসূচিতে যুক্ত হচ্ছেন না।

অনুপস্থিত শিক্ষকদের আন্দোলনে ফেরানো নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। একজন শিক্ষক বলেন, সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য যাদের রাখা হয়েছিল, তাদের অনেকেই এখন উপস্থিত হচ্ছেন না। অনলাইনে যুক্ত না থাকা শিক্ষকদেরও আবার আন্দোলনে সম্পৃক্ত করার বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়।

বৈঠকের একপর্যায়ে একজন শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘স্যার এটা বলেন, আমরা বলি হয়ে যাই?’। একই আলোচনায় শিক্ষকরা বসে আছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সিকিউটিভ কমিটিও বিষয়টি নিয়ে গড়িমসি করছে বলে অভিযোগ করা হয়।

আন্দোলনের পেছনে কার স্বার্থ?
আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থ থাকার অভিযোগও তুলেছেন কয়েকজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাদের কেউ কেউ দাবি করেন, ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের কিছু শিক্ষক ও শিক্ষার্থী নিজেদের প্রভাব বা প্রশাসনিক সুবিধার জন্য আন্দোলনকে ব্যবহার করছেন।

কয়েকজন সাধারণ শিক্ষার্থী আরও অভিযোগ করেন, আন্দোলনে বহিরাগতদের যুক্ত করা হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে।
 
জুম অ্যাপে গোপন বৈঠক নিয়ে প্রশ্ন
এর মধ্যে গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে চুয়েটের কয়েকজন শিক্ষক জুম প্ল্যাটফর্মে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকেই আন্দোলনকে আরও সক্রিয় রাখা, শিক্ষার্থীদের সামনে রেখে কর্মসূচি চালানো এবং সড়ক অবরোধের মতো কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বৈঠকে বঙ্গবন্ধু পরিষদের সদস্য ড. শেখ মুহাম্মদ হুমায়ুন কবির, আওয়ামীপন্থী শিক্ষক অধ্যাপক ড. মঈনুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান, জামায়াতপন্থী শিক্ষক ড. বশির জিসান, ড. মোস্তফা কামাল, ড. আহসানুল্লাহ, মোহাম্মদ শামসুজ সাদেকিন, বঙ্গবন্ধু শিক্ষক পরিষদের নেতা অধ্যাপক ড. ফৌজিয়া গুলশান রশিদ লোপা ও অধ্যাপক উদয়সহ কয়েকজন শিক্ষক ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। বৈঠকে অংশ নেওয়ার বিষয়টি শিক্ষক ড. ফৌজিয়া গুলশান রশিদ লোপা স্বীকার করেছেন। অন্যদের সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ক্যাম্পাসের বাইরে প্রভাব
শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির প্রভাব পড়েছে চুয়েটসংলগ্ন পরিবহন ও ব্যবসায়েও। বিশ্ববিদ্যালয়গামী বাস ও স্থানীয় যানবাহনে যাত্রী কমে যাওয়ায় আয় কমেছে বলে জানিয়েছেন পরিবহনসংশ্লিষ্টরা। ক্যান্টিন ও ক্যাফেটেরিয়াগুলোতেও বিক্রি কমেছে।

শিক্ষার্থী না থাকায় পচনশীল খাবার নষ্ট হয়ে লোকসান হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী। শাটডাউনের মেয়াদ বাড়তে থাকায় তাদের জীবন-জীবিকাও সংকটে পড়েছে।

আন্দোলনের শুরু যেভাবে
চুয়েটের বর্তমান অচলাবস্থার সূত্রপাত ২১ সেপ্টেম্বর। ওই দিন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে উপাচার্যের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে কুয়েটের অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মাত্র ৫৬ দিন আগে, ২৭ জুলাই অধ্যাপক সায়েম চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন।

উপাচার্য পরিবর্তনের কারণ প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ না থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়। এরপরই শুরু হয় বিক্ষোভ। ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শাটডাউন ও ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন কর্মসূচি শুরু হয়। পরে শিক্ষক সমিতিও কর্মবিরতিতে যায়।

২৪ সেপ্টেম্বর নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম অনলাইনে যোগদান করেন। তবে আন্দোলনের মধ্যে তাঁর ক্যাম্পাসে সশরীরে দায়িত্ব গ্রহণ নিয়ে অচলাবস্থা অব্যাহত রয়েছে। তিনি পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করছেন বলে জানিয়েছেন।

সামনে দুটি সংকট
চুয়েটের আন্দোলনে এখন একদিকে সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবি, অন্যদিকে নতুন উপাচার্যের নিয়োগ ও দায়িত্ব গ্রহণের প্রশ্ন। এর মাঝখানে আটকে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম।

আন্দোলনকারীরা তাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার কথা বলছেন। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ চাইছে দ্রুত ক্লাস-পরীক্ষা ফিরুক। ফলে চুয়েটের সংকট এখন শুধু উপাচার্য পরিবর্তনের বিরোধে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম কত দ্রুত স্বাভাবিক হবে—সেই প্রশ্নও।

এই বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেককে তাঁর বক্তব্যে নিতে একাধিক মুঠোফোনে কল করা হলে সংযোগ তোলেননি।

ডিআর