ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ পৌর শহরে কথিত ‘কিশোর গ্যাং’-এর দৌরাত্ম্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, শহরের বিভিন্ন এলাকায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে কিশোর-তরুণদের কয়েকটি দল। চুরি, ছিনতাই, মাদক সেবন, ইভটিজিং ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির মতো ঘটনায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বাসিন্দারা।
সম্প্রতি স্কলার্স একাডেমি স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি ইসলামিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আসা মেয়েদের কয়েকজন কিশোর উত্ত্যক্ত করে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় বাধা দিতে গেলে স্থানীয় এক শিক্ষককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পৌর শহরের ঈদগাহ মাঠ, রেলস্টেশনপাড়া, টিএন্ডটি পাড়া, গুয়াগাঁও, কলেজ বাজার, মাস্টার মোড়, মুক্তিযোদ্ধাপাড়া ও মুন্সিপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। পাশাপাশি রাতের বেলায় বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে বৈদ্যুতিক তার চুরি এবং নির্মাণাধীন ভবন থেকে রড, সিমেন্টসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী চুরির অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, এসব ঘটনায় বখাটে যুবক, ছিঁচকে চোর এবং স্কুল-কলেজপড়ুয়া কিছু কিশোর জড়িয়ে পড়ছে। কখনো কখনো স্থানীয়রা সন্দেহভাজনদের আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করলেও অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পৌর শহরের শিক্ষক দুলাল সরকার বলেন, ‘সম্প্রতি স্কলার্স একাডেমি স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি ইসলামিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আসা মেয়েদের উত্ত্যক্ত করছিল কিশোর গ্যাংয়ের কিছু সদস্য। আমি বাধা দিতে গেলে তারা উল্টো আমাকে হুমকি দেয়। এসব কিশোরের বিরুদ্ধে ছিনতাই ও মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ততারও অভিযোগ রয়েছে।’
পরিবার নিয়ে চলাচলে আতঙ্কের কথা জানিয়ে স্থানীয় আরেক শিক্ষক বলেন, ‘রাতে পরিবার নিয়ে রাস্তায় বের হতে ভয় লাগে। তুচ্ছ বিষয় নিয়েই তারা সাধারণ মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও নাজেহাল করে। সন্ধ্যার পর পৌর শহরের কাপড়ের বাজার, স্বর্ণকারপট্টি, বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন, চৌরাস্তা, ঈদগাহ মাঠ, কবরস্থান ও রেললাইনের আশপাশে তাদের আনাগোনা বেড়ে যায়।’
কিশোর অপরাধ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে পীরগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ বদরুল হুদা বলেন, ‘হোস্টেলে ছুরি দেখিয়ে আমাদের এক শিক্ষার্থীর মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নিয়েছে ৮ থেকে ১০ জনের একটি কিশোর দল। অল্প বয়সী এসব কিশোর দলবদ্ধভাবে চুরি, ছিনতাই, মাদক ও মারামারিতে জড়িয়ে পড়ছে।’
পীরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জিয়াউল ইসলাম জিয়া বলেন, কিশোরেরা দিন দিন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। সন্ধ্যার পর পৌর শহরে মারামারির ঘটনা বেশি ঘটছে। কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে অভিভাবকদের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
ঠাকুরগাঁও জজকোর্টের আইনজীবী আবু সায়েম বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সুযোগে পীরগঞ্জে কিশোর অপরাধ ও মাদক সেবন-বাণিজ্য বাড়ছে। তাঁর দাবি, অপরাধীরা রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় থাকার চেষ্টা করে এবং কখনো কখনো রাজনৈতিকভাবে তাদের ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের কর্মকাণ্ড চলতে থাকলে ভবিষ্যতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
এ বিষয়ে পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পৌর প্রশাসক গোলাম রব্বানী সরদার বলেন, ‘কিশোর অপরাধ ও মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন তৎপর রয়েছে। গ্রাম পুলিশ ও আনসার সদস্যদের পাশাপাশি আমরা সমন্বিতভাবে কাজ করছি। ইতোমধ্যে জনসচেতনতামূলক সভা করা হচ্ছে। মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিটি ইউনিয়নের ওয়ার্ডে কমিটি গঠন করা হবে এবং কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার খোদাদাত হোসেন বলেন, পীরগঞ্জে কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়ে তাঁর কাছে এখনো বিস্তারিত তথ্য নেই। তবে কেউ কিশোর গ্যাং হিসেবে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তা প্রতিহত করবে এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমান বলেন, সামাজিক অবক্ষয় ও পারিবারিক তদারকির অভাবের কারণে কিশোরেরা বিপথগামী হচ্ছে। তাদের অপরাধ থেকে দূরে রাখতে পরিবার ও সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আমার নির্বাচনী এলাকায় কোনো কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য অপরাধে জড়ালে, সে যে দলেরই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে; কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।’
এসএ




Comments