Image description

কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকতা সনদ কিংবা সরকারি সুবিধা ছাড়াই নদীভাঙনকবলিত এলাকায় গত ৫২ বছর ধরে নামমাত্র ১ টাকার বিনিময়ে সুবিধাবঞ্চিত হাজারো শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে চলেছেন ৭৬ বছর বয়সী প্রবীণ শিক্ষাব্রতী লুৎফর রহমান। অবশেষে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এই নির্লোভ কাজের অনন্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেলেন তিনি। বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে তাঁকে বিশেষ সম্মাননা জানানোর পাশাপাশি জীবনব্যাপী অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশেষ অবসরভাতা প্রদানের অনুশাসন জারি করেছেন প্রধানমন্ত্রী।

জানা যায়, ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ বন্যা ও যমুনার নদীভাঙনে ভিটেমাটিসহ ৮০ বিঘা ফসলি জমি এবং গৃহপালিত গবাদিপশু হারিয়ে এক লহমায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছিল লুৎফর রহমানের পরিবার। এরপর ওয়াপদা বাঁধের টিনের ছাপরা ঘরে শুরু হয় নতুন জীবন সংগ্রাম। অর্থাভাবে নিজে কলেজে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন ভেঙে গেলেও তিনি দমে যাননি। নিজের ভিতরের আক্ষেপকে শক্তিতে রূপান্তর করে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়াতে শুরু করেন। স্থানীয়দের পরম ভালোবাসায় তিনি আজ এলাকায় পরিচিত ‘এক টাকার মাস্টার’ নামে।

১৯৫০ সালের ৭ আগস্ট ফুলছড়ি উপজেলার উড়িয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন লুৎফর রহমান। ১৯৭২ সালে ফুলছড়ি উপজেলার গুণভরি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এসএসসি পাস করলেও চরম দারিদ্র্যের কারণে তাঁর উচ্চশিক্ষা আর হয়ে ওঠেনি। সেই কষ্ট থেকেই পণ করেছিলেন দারিদ্র্য কিংবা নদীভাঙনের কারণে কোনো শিশুর শিক্ষা যেন থমকে না যায়। ১৯৭২ সাল থেকেই তিনি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের অবৈতনিক পাঠদান শুরু করেন। পরবর্তীতে অভিভাবকদের অনুরোধে প্রতীকী দক্ষিণা হিসেবে প্রতিদিন ১ টাকা করে নেওয়া শুরু করেন।

দীর্ঘ অর্ধশতাব্দীতে প্রতিদিন ফজরের নামাজ পরেই পুরোনো সাইকেলে চেপে বা পায়ে হেঁটে বাগুড়িয়া, মদনেরপাড়া, পুলবন্দি, চন্দিয়া, ঢুলিপাড়া, কঞ্চিপাড়া, মধ্যপাড়া ও পূর্বপাড়াসহ আশপাশের বিভিন্ন গ্রামে শিশুদের কাছে পৌঁছে যান তিনি। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৭০ জন শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন ব্যাচে পাঠদান করান তিনি। তাঁর হাত ধরে শিক্ষা জীবন শুরু করা শত শত শিক্ষার্থী আজ দেশ-বিদেশে চিকিৎসক, ম্যাজিস্ট্রেট ও কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে স্বমহিমায় সুপ্রতিষ্ঠিত।

লুৎফর রহমান মাস্টারের এই আজীবন আত্মত্যাগ ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রসঙ্গে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘গণ উন্নয়ন কেন্দ্র’ (জিইউকে)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী প্রধান এম. আবদুস্ সালাম বলেন, ‘লুৎফর রহমান মাস্টারের অসাধারণ শিক্ষাব্রতকে সম্মান জানাতে আমরা ২০২০ সালে তাকে ‘জিইউকে গুণিজন সম্মাননা’ প্রদান করেছিলাম। তবে তিনি দরিদ্র শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াতে যে আজীবন অবদান রেখেছেন, তার কাছে সামাজিক সম্মাননা যথেষ্ট নয়। তার এই নিঃস্বার্থ অবদান মানুষ শত শত বছর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ রাখবে।’

তিনি আরও বলেন, যমুনাপাড়ের সুবিধাবঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষার ভিত গড়ে তুলতে তিনি যে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছেন, তা বিরল। প্রাতিষ্ঠানিক সনদ বা সুযোগ-সুবিধার তোয়াক্কা না করে একজন মানুষ কীভাবে সমাজকে বদলে দিতে পারেন, লুৎফর রহমান মাস্টার তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এই শিক্ষাব্রতীর যথাযথ রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও নিয়মিত ভাতার ব্যবস্থা হওয়া অত্যন্ত আনন্দের ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ।

এদিকে শিক্ষক দিবস উপলক্ষে এবং ঈদুল আজহায় এই প্রবীণ শিক্ষকের পাশে দাঁড়িয়েছে প্রশাসন। জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সরকারি সহায়তা ও শুভেচ্ছা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে তার জরাজীর্ণ টিনের ঘরে।

নিজের জীবন নিয়ে কোনো খেদ নেই লুৎফর রহমানের। স্বীকৃতি পাওয়ার অনুভূতি ও শিক্ষার্থীদের সাফল্য নিয়ে তিনি তৃপ্তির হাসিতে বলেন, আমার ছাত্ররা আজ দেশের বড় বড় পদে গিয়ে সেবা করছে, ওদের হাসিমুখ দেখলেই আমার জীবনের সব কষ্ট আর না-পাওয়ার আক্ষেপ দূর হয়ে যায়।

ডিআর