Image description

চট্টগ্রাম শিশু একাডেমিতে পদে তিনি একজন ডাটা এন্ট্রি অপারেটর। তবে প্রশাসনিক প্রভাব ও ঊর্ধ্বতন মহলের আশীর্বাদে পুরো একাডেমিই যেন তাঁর নিয়ন্ত্রণে—এমন অভিযোগ উঠেছে মো. আবদুল খালেক নামে এক কর্মচারীর বিরুদ্ধে। ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে কোটি টাকার সঞ্চয় আত্মসাৎ, এতিম শিশুদের পোশাক ও খাবারের অর্থ আত্মসাৎ, অনিয়মের মাধ্যমে ভর্তি-বাণিজ্য এবং দাপ্তরিক কক্ষে খাট-আলনাসহ গৃহস্থালি সামগ্রী রেখে ব্যক্তিগতভাবে বসবাসের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

একাডেমির বিভিন্ন অনিয়ম ও খালেকের কথিত দুর্নীতির বিবরণ তুলে ধরে সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দেন একাডেমির দুই অস্থায়ী কর্মকর্তা। তবে অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে উল্টো ওই দুই অভিযোগকারীকে চাকরি হারাতে হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে পাওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, চট্টগ্রাম শিশু একাডেমির নিজস্ব তহবিলে সংরক্ষিত প্রায় কোটি টাকার সঞ্চয় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের নামে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে আত্মসাৎ করা হয়েছে। জেলা পরিষদের অনুদানে সম্পন্ন কাজকে একাডেমির নিজস্ব উন্নয়নকাজ হিসেবে দেখিয়ে ভুয়া হিসাব তৈরি এবং সেই হিসাবের বিপরীতে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে। এ ছাড়া দরপত্র ছাড়াই অতিরিক্ত দামে মালামাল কেনার রসিদ দেখিয়ে নিয়মিত সরকারি অর্থের অপব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, একাডেমির অডিটোরিয়াম বা হলরুম বিভিন্ন সংস্থাকে ভাড়া দেওয়া এবং চেয়ার-টেবিল ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ভাড়া বাবদ প্রাপ্ত অর্থের অন্তত ৬০ শতাংশ খালেক আত্মসাৎ করেন। এমনকি কোনো প্রশিক্ষক একাডেমির বাইরে বা ভেতরে ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষার্থী পড়ালে তাঁর আয়ের ৫০ শতাংশ খালেককে দিতে হয় বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক শিক্ষক জানান, খালেকের কথামতো না চললে চাকরি হারানোসহ নানা ধরনের প্রশাসনিক হয়রানির মুখে পড়তে হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি বিধি অনুযায়ী বাসাভাড়া বাবদ অর্থ গ্রহণ করলেও খালেক একাডেমির ২০২ নম্বর দাপ্তরিক কক্ষে খাট, আলনাসহ বিভিন্ন গৃহস্থালি সামগ্রী রেখে ব্যক্তিগতভাবে বসবাস করছেন। এ ছাড়া অফিসের পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও অন্যান্য কর্মচারীকে দিয়ে নিজের ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও গৃহস্থালির কাজ করানোর অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

অভিযোগকারীদের দাবি, শুক্রবার ও শনিবার খালেক নিজে কার্যালয়ে উপস্থিত না থাকলেও তাঁর মনোনীত ‘ক্যাশিয়ার’ মো. সাইফুলের মাধ্যমে দাপ্তরিক হিসাব ও কথিত অনৈতিক লেনদেন পরিচালিত হয়। এ ছাড়া ইদ্রিস মিয়া নামে এক কর্মচারীকে দিয়ে একাডেমি প্রাঙ্গণে দোকান পরিচালনা করা হচ্ছে। ওই দোকান থেকে প্রতি মাসে কয়েক লাখ টাকা আয় হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

দেশের অন্যান্য জেলা শিশু একাডেমির তুলনায় চট্টগ্রাম শিশু একাডেমিতে ভর্তি ফি অস্বাভাবিক বেশি বলে অভিযোগ করেছেন অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০ টাকার ভর্তি ফরম একাডেমি প্রাঙ্গণে গিয়ে নির্ধারিত মাধ্যমে অনলাইনে পূরণ করতে ব্যয় হয় ৩০০ টাকা। বছরে প্রায় চার হাজার ফরম বিক্রির মাধ্যমে গড়ে ১২ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

অনলাইন সার্ভারের পাসওয়ার্ড ও প্রবেশাধিকার খালেকের একক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি। এ কারণে ভর্তির নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পরও অর্থের বিনিময়ে শিক্ষার্থী ভর্তি এবং সনদ উত্তোলনে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে, শিশু বিকাশ কেন্দ্রের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ এক কর্মচারীকে বরখাস্ত করে নিজের শ্যালক আরফাতকে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে খালেকের বিরুদ্ধে।

পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে এতিম ও দরিদ্র শিশুদের নতুন পোশাক কেনার জন্য সরকারি বরাদ্দ থাকলেও মাত্র ৩০ জন শিশুকে পোশাক দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি শিশুদের নিম্নমানের খাবার পরিবেশন করে উন্নতমানের ক্যাটারিংয়ের নামে ভুয়া ভাউচার তৈরি এবং ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের হিসাব থেকে লাখ লাখ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব পরিচালনায় খালেকের একক স্বাক্ষর ব্যবহৃত হয়।

এর আগে ২০২৫ সালের মার্চে খালেকের কথিত অনিয়মের প্রতিবাদ করায় মারওয়া নামে এক শিক্ষিকাকে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে ২০২৬ সালের ১৬ আগস্ট দুদকে সরাসরি অভিযোগ দেওয়ার পর আরও দুই অস্থায়ী কর্মকর্তা চাকরি হারিয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের মতে, এসব ঘটনায় একাডেমির অভ্যন্তরে অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলার পরিবেশ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। তবে চাকরিচ্যুতির সঙ্গে অভিযোগ দাখিলের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

অস্থায়ী প্রশিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে দেড় লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে খালেকের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, যোগ্য ও তরুণ প্রশিক্ষকদের বাদ দিয়ে অর্থের বিনিময়ে বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।

এ ছাড়া স্বল্প বেতনের সরকারি কর্মচারী হওয়া সত্ত্বেও খালেক গ্রামের বাড়িতে কোটি টাকা ব্যয়ে রাজকীয় ভবন নির্মাণ করেছেন এবং নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে তাঁর আয়, সম্পদ ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা মো. কাউছার আহমেদ অভিযুক্ত খালেকের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেন, “চাকরি থেকে অব্যাহতি পাওয়া দুজন কর্মকর্তা একাডেমির বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ মিথ্যা তথ্য রটাচ্ছেন। অভিযুক্ত খালেকের কোনো দোষ নেই। আপনারা অফিসে আসুন, বিস্তারিত জানানো হবে।”

অন্যদিকে, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মো. আবদুল খালেক তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমার বিরুদ্ধে তোলা সব অভিযোগ কাল্পনিক ও মিথ্যা। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় এবং মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর অপরাধে ওই দুই কর্মচারীকে বরখাস্ত করা হয়েছে। পারলে তারা অভিযোগের প্রমাণ দিক।”

তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, আর্থিক হিসাব, ব্যাংক লেনদেন ও নিয়োগসংক্রান্ত তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা গেলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সরকারি অর্থের ব্যবহারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এসএ