উচ্চ শব্দে মাইকিংয়ে অতিষ্ঠ পটুয়াখালী পৌরবাসী
ব্যাহত স্বাভাবিক জীবনযাত্রা
বাসায় অসুস্থ মানুষ বিশ্রাম নিচ্ছেন, শিক্ষার্থীরা পড়ার টেবিলে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনার চেষ্টা করছে, আবার কোনো দোকানে ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলছেন ব্যবসায়ীরা। এমন সময় হঠাৎ ভেসে আসে মাইকের বিকট শব্দ—‘সুখবর, সুখবর, সুখবর!’ সকাল থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত চলা এমন প্রচারণায় ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। উচ্চ শব্দে মাইকিংয়ের কারণে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন পটুয়াখালী পৌরসভার বাসিন্দারা।
ক্লিনিক, কোচিং সেন্টার, দোকান ও শোরুমের বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি কম দামে মহিষের মাংস, হাঁস-মুরগির বাচ্চা এবং মোবাইল সিম বিক্রির প্রচারণায় ব্যবহার করা হচ্ছে এসব মাইক। পৌর শহরের বিভিন্ন সড়ক ও অলিগলিতে মাইক লাগানো ভ্যান ও ইজিবাইক নিয়ে ঘুরে ঘুরে চালানো হচ্ছে এসব প্রচার। এতে বাসার দরজা-জানালা বন্ধ করেও অনেক সময় বিকট শব্দের যন্ত্রণা থেকে রেহাই মিলছে না। উচ্চ শব্দের কারণে স্কুল-কলেজের শ্রেণিকক্ষের পাশাপাশি বাসাবাড়িতেও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটছে। ব্যাহত হচ্ছে অসুস্থ ও বয়স্ক ব্যক্তিদের বিশ্রাম।
পটুয়াখালী সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. সাগর বলে, “স্কুল চলাকালে মাইকের শব্দের কারণে অনেক সময় আমরা শিক্ষকের কথা শুনতে পাই না। বাসায় পড়তে বসলেও মাইকের শব্দে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে আমাদের অনেক কষ্ট হয়।”
সদর রোডের ব্যবসায়ী রেজাউল করিম বলেন, “প্রতারণামূলক প্রচারণার মাইকের শব্দে আমরা সব সময় অতিষ্ঠ থাকি। এর পাশাপাশি অটোরিকশা ও টমটমের উচ্চ শব্দের হর্নও আমাদের ভোগান্তি বাড়িয়ে দিচ্ছে।”
আইনজীবী আবু সাঈদ বলেন, “শব্দদূষণের অন্যতম কারণ হলো, মাইক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অনেকেরই কোথায় কতটুকু শব্দ ব্যবহার করা উচিত, সে সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা নেই। এ কারণে তারা উচ্চ শব্দে প্রচারণা চালান। ফলে সাধারণ মানুষকে শব্দদূষণের ভোগান্তি পোহাতে হয়।”
মাইক লাগানো ভ্যান ও ইজিবাইকে প্রচারণার কাজে নিয়োজিত কয়েকজন জানান, সকাল থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় প্রচারণা চালিয়ে তাঁরা দৈনিক এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত পান। এ আয় দিয়েই তাঁরা সংসার চালান।
শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২৫ অনুযায়ী, হাসপাতাল, ক্লিনিক, আদালত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশের ১০০ মিটার এলাকাকে নীরব এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় দিনের বেলায় শব্দের সর্বোচ্চ সীমা ৫০ ডেসিবেল এবং রাতে ৪০ ডেসিবেল নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া জনপরিসরে মাইক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত বিধিনিষেধ রয়েছে।
এ বিষয়ে পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন ডা. খালেদুর রহমান বলেন, “শব্দদূষণ মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। এ বিষয়ে পৌরসভাসহ বিভিন্ন দপ্তরের মাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়। পাশাপাশি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে।”
পৌর প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ তারেক হাওলাদার বলেন, “পৌরসভা থেকে ব্যবসায়ীরা ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহের সময় তাঁদের শব্দদূষণ প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে অবহিত করা হয়। পাশাপাশি শব্দদূষণ প্রতিরোধে বিভিন্ন সময় অভিযান চালানো হয়। মোটরসাইকেল, অটোরিকশা ও টমটমের শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।”
তিনি আরও বলেন, শব্দদূষণ প্রতিরোধে নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখতে মাইক ব্যবহারে শব্দের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ, নীরব এলাকার বিধিনিষেধ কার্যকর করা এবং নিয়মিত তদারকি জোরদার করা জরুরি। অন্যথায়, উচ্চ শব্দের এই ভোগান্তি থেকে পৌরবাসীর মুক্তি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
এসএ




Comments