ইউপিডিএফের অনির্দিষ্টকালের অবরোধে বিপর্যস্ত সাজেক, ধুঁকছে পর্যটন শিল্প
চুক্তিবিরোধী পাহাড়ি সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) ডাকা অনির্দিষ্টকালের হঠকারী অবরোধে রাঙামাটির সাজেক ও খাগড়াছড়ির দীঘিনালা সড়কে টানা আট দিন ধরে চরম অচলাবস্থা বিরাজ করছে। গত ২২ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই দীর্ঘ অবরোধের ফলে সাজেক ও বাঘাইছড়ি অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন থাকায় পাহাড়ি জনপদে খাদ্যপণ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি এবং জরুরি চিকিৎসা সেবার সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
কাজ হারিয়ে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন এলাকার খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র পেশাজীবীরা। বিশেষ করে শীত মৌসুমের প্রাক্কালে সাজেকে পর্যটক আগমন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হোটেল, রিসোর্ট, পরিবহন এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা লাখ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ সেপ্টেম্বর থেকে পানছড়ি ও সাজেক এলাকায় ইউপিডিএফ এবং জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) মধ্যে অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র সংঘাতের সূত্রপাত হয়। পরবর্তীতে গত ২৯ সেপ্টেম্বর এক শিশু গুলিবিদ্ধ হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নেয়। এর ধারাবাহিকতায় গত ৮ ও ১১ অক্টোবর আল্টিমেটাম ও দফায় দফায় অবরোধের ডাক দেয় ইউপিডিএফ।
সর্বশেষ গত ২২ অক্টোবর সাজেকের উজোবাজারে আটকে পড়া পর্যটকদের সেনাবাহিনীর কঠোর নিরাপত্তায় ও প্রহরায় নিরাপদে ফিরিয়ে আনার সময় ইউপিডিএফের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা অতর্কিত হামলা চালায়। এতে সেনা সদস্য ও পর্যটকসহ অন্তত ৬-৭ জন গুলিবিদ্ধ ও আহত হন। নিজেরা এই বর্বরোচিত হামলা চালালেও পরবর্তীতে লাদেন চাকমা ইস্যুকে পুঁজি করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার ও প্রোপাগাণ্ডা ছড়ায় সংগঠনটি।
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গত ২৬ অক্টোবর গঙ্গারাম বাজারে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির দুই সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ সুপারদের সমন্বয়ে গঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ইউপিডিএফের প্রতিনিধি বাবুধন চাকমা ও উষাতন চাকমাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসে।
বৈঠকে ইউপিডিএফের পক্ষ থেকে মামলা প্রত্যাহার এবং জেএসএস-কে সাজেক এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়ার মতো অবাস্তব ও একতরফা ৫ দফা দাবি পেশ করা হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জনদুর্ভোগ কমাতে অবরোধ প্রত্যাহার করে স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে আগামী ৫ নভেম্বর পর্যন্ত সময় চাওয়া হলেও, ইউপিডিএফ প্রশাসনকে মাত্র ৫ দিনের জন্য অবরোধ স্থগিতের কথা জানিয়ে কোনো চূড়ান্ত সুরাহা ছাড়াই বৈঠক শেষ করে। ফলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কাটেনি।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সাজেক ও এর আশপাশের সীমান্ত অঞ্চল মূলত অবৈধ অস্ত্র চোরাচালান এবং পাহাড়ের বিশাল চাঁদাবাজির অন্যতম নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সম্প্রতি জেএসএস কর্তৃক কিছু এলাকা দখল হয়ে যাওয়ায় ইউপিডিএফের চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য ও একচ্ছত্র আধিপত্য চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
মূলত নিজেদের সেই হারানো আধিপত্য, কৌশলগত অবস্থান ও অবৈধ আয়ের পথ টিকিয়ে রাখতেই সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে সাজেক পর্যটন সড়ককে অবরুদ্ধ করে রেখেছে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটি। একটি সশস্ত্র দলের আধিপত্যের লড়াই ও সংকীর্ণ স্বার্থের বলি হয়ে আজ সাজেকের সাধারণ মানুষ এবং বিকাশমান পর্যটন শিল্প ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।
ডিআর




Comments