শীতের অপেক্ষায় জাবি, বাস্তুতন্ত্রের বিপন্নতায় কমছে পরিযায়ী পাখির আবাস
শীত এখনো পুরোপুরি নামেনি। তবে ভোরের হাওয়ায় হালকা শীতের আভাস মিলছে। ঘাসে জমছে শিশিরকণা, বিকেলের রোদেও এসেছে নরম ভাব। ঋতু বদলের এই সময়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকগুলোর দিকে তাকালে স্বাভাবিকভাবেই মনে পড়ে শীতের অতিথিদের কথা। প্রতিবছর এই সময়টায় দূরদেশ থেকে উড়ে আসা পরিযায়ী পাখিদের অপেক্ষায় থাকেন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও প্রকৃতিপ্রেমীরা।
তীব্র শীত ও খাদ্যসংকট থেকে বাঁচতে প্রতিবছর শীতপ্রধান অঞ্চল থেকে হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আসে নানা প্রজাতির পরিযায়ী পাখি। কয়েক মাস অবস্থানের পর শীত শেষে তারা আবার ফিরে যায় নিজেদের আবাসে। একসময় জাবির জলাশয়গুলো ছিল এসব পাখির অন্যতম পরিচিত আশ্রয়স্থল। কিন্তু গত কয়েক বছরে বদলে গেছে সেই চিত্র। কমেছে পাখির সংখ্যা, অনেক জলাশয়েই আগের মতো দেখা মেলে না অতিথিদের।
কয়েক বছর আগেও শীত মৌসুমে জাবির লেকগুলোতে কয়েক হাজার পরিযায়ী পাখির সমাগম ঘটত। প্রাণিবিদ্যা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কোনো কোনো মৌসুমে এ সংখ্যা ছয় থেকে সাত হাজার পর্যন্ত উঠেছিল। পরবর্তী সময়ে তা কমে আড়াই থেকে তিন হাজারের মধ্যে নেমে আসে। ২০২৫ সালের শীত মৌসুমে বিভিন্ন প্রতিবেদনে সংখ্যাটি আরও কমে প্রায় দুই হাজারের কাছাকাছি থাকার তথ্য উঠে আসে। আর ২০২৫-২৬ মৌসুমের শেষ দিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রায় দেড় হাজার পাখির হিসাবও পাওয়া যায়।
এই পতনকে শুধু পাখির স্বাভাবিক ওঠানামা হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, জাহাঙ্গীরনগরের সামগ্রিক পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট-বড় প্রায় ৩০টি জলাশয়ের অনেকগুলোই এখন পাখির জন্য আগের মতো উপযোগী নেই। এর অন্যতম কারণ মানুষের বাড়তি চাপ। লেকের আশপাশে সারাদিন মানুষের চলাচল, যানবাহনের শব্দ, হৈচৈ এবং ছবি তোলার জন্য পাখির খুব কাছে চলে যাওয়া তাদের স্বাভাবিক বিচরণে বাধা তৈরি করছে। বিশেষ করে পরিবহন চত্বরসংলগ্ন লেকের আশপাশে মানুষের উপস্থিতি বেশি থাকায় সেখানে পাখিরা নিরাপদ বোধ করে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
শুধু শব্দ ও মানুষের ভিড় নয়, সংকট তৈরি হয়েছে পাখিদের খাবারেও। আগে লেকের পানিতে প্ল্যাঙ্কটন, জলজ পোকামাকড়, ছোট মাছ ও বিভিন্ন জলজ প্রাণীর প্রাচুর্য ছিল। এগুলো ছিল পরিযায়ী পাখির গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য। কিন্তু পানির গুণগত মানের অবনতি, দূষণ এবং জলাশয়ের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় এসব খাদ্যের প্রাপ্যতা কমেছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে আশ্রয় থাকলেও পর্যাপ্ত খাবার না থাকায় পাখিরা অন্যত্র চলে যেতে পারে।
জলাশয়ের ব্যবস্থাপনাও বড় একটি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোথাও কচুরিপানা বা জলজ উদ্ভিদ অতিরিক্ত বেড়ে গেছে, কোথাও আবার প্রাকৃতিক জলজ উদ্ভিদের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও আবাসস্থল সংকোচন। ক্যাম্পাস ও আশপাশে উঁচু ভবন নির্মাণ, গাছ কাটা, জলাশয়ের স্বাভাবিক পরিবেশের পরিবর্তন এবং বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ পাখিদের বিচরণ ও আশ্রয়ের ওপর চাপ তৈরি করছে। বৃহত্তর জলাভূমি হারিয়ে যাওয়াও পরিযায়ী পাখিদের খাদ্য ও বিশ্রামের জায়গা কমিয়ে দিচ্ছে।
পরিযায়ী পাখির এই কমে যাওয়া শুধু একটি মৌসুমি সৌন্দর্য হারানোর বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জাহাঙ্গীরনগরের সামগ্রিক জীববৈচিত্র্যের ভবিষ্যৎ। পাখিরা কোনো একটি জলাশয়ে থাকার জন্য শুধু পানি খোঁজে না। বরং তাদের প্রয়োজন খাবার, নিরাপদ আশ্রয়, নিরিবিলি পরিবেশ এবং স্বাভাবিক জলজ প্রতিবেশ।
তাই পাখিদের ফিরিয়ে আনতে শুধু শীতের আগে লেক পরিষ্কার করাই যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রতিটি জলাশয়ের জন্য আলাদা ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা, পানির গুণগত মান পর্যবেক্ষণ, প্রাকৃতিক জলজ উদ্ভিদ সংরক্ষণ, মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং পাখির আবাসস্থলকে দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষিত করার উদ্যোগ প্রয়োজন।
শীতের আগমনী বার্তার সাথে সাথে দূর আকাশে পরিযায়ী পাখিদের দীর্ঘ যাত্রা শুরুর সময়ও ঘনিয়ে আসছে। এবার জাহাঙ্গীরনগরের লেকগুলোতে কতটা অতিথি নামে, কোন কোন জলাশয় তাদের আশ্রয় দেয়, তার উত্তর মিলবে শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো পাখিরা ফিরে আসার মতো জাহাঙ্গীরনগর কি তাদের আগের সেই পরিবেশ ধরে রাখতে পারছে?
হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে আসা পাখিদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করা গেলে হয়তো আবারও শীতের সকালে লেকের পানিতে দেখা যাবে হাজারো ডানার মেলা। আর সেই দৃশ্য শুধু জাবির সৌন্দর্যই ফিরিয়ে দেবে না, জানান দেবে ক্যাম্পাসের প্রকৃতিও এখনো বেঁচে আছে।
এসএ




Comments