আ.লীগের নিয়োগ দেওয়া ঠিকাদাররাই বহাল ‘মন্ত্রণালয়ের আদেশে’
নতুন ঠিকাদার নিয়োগে উন্মুক্ত দরপত্রের নির্দেশ দিয়েও একই আদেশে পুরোনো ঠিকাদারদের আরও তিন মাসের কাজ দিয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। ফলে আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগ পাওয়া ঠিকাদারেরাই সরকারি খাদ্যশস্য পরিবহন ও হ্যান্ডলিংয়ের কাজে বহাল থাকছেন। কোথাও এক যুগ, কোথাও দেড় যুগ ধরে এই খাতে নতুন কোনো ঠিকাদার আসেননি। চট্টগ্রামে আইআরটিসির টেন্ডার হয়নি ২০১৩ সাল থেকে।
জানা গেছে, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সরকার বদলালেও খাদ্য অধিদপ্তরের ঠিকাদারি ব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন আসেনি। নতুন ঠিকাদার নিয়োগের কথা কাগজে থাকলেও বাস্তবে আগের সিন্ডিকেটই কাজ করছে। দফায় দফায় মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ নিয়ে বিগত সরকারের লোকজন অধিদপ্তর থেকে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে—উঠেছে এমন অভিযোগও।
একই আদেশে দুই নির্দেশ
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ অফিস আদেশে চলতি বছরের ১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত পুরোনো পরিবহন ঠিকাদারদের কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আছে মেজর ক্যারিয়ার, ডিবিসিসি, সিআরটিসি ও ডিআরটিসিসহ বিভিন্ন শ্রেণির ঠিকাদার। শ্রম ও হ্যান্ডলিং ঠিকাদারদের বিষয়েও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে খাদ্য অধিদপ্তরকে বলা হয়েছে।
অন্যদিকে একই আদেশে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া শেষ করার সময়সীমাও বেঁধে দিয়েছে মন্ত্রণালয়। অর্থাৎ নতুন দরপত্রের নির্দেশ আছে, কিন্তু সেই নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত কাজ থাকছে পুরোনোদের হাতে। আদেশে এ-ও বলা হয়েছে, ৩১ ডিসেম্বরের পর কোনো অবস্থাতেই চুক্তির মেয়াদ আর বাড়ানো হবে না।
দেড় যুগ ধরে একই চিত্র
ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী, রংপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট ও চট্টগ্রামে আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকদের অধীন পরিবহন ও হ্যান্ডলিং খাতের অবস্থা প্রায় অভিন্ন। কোথাও ১২ বছর, কোথাও ছয় বছর, আবার কোথাও ১৮ বছর ধরে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ বন্ধ।
খাদ্য অধিদপ্তরের পুরোনো নথিতেও মেয়াদ বাড়ানোর এমন নজির আছে। ২০২৪ সাল পর্যন্ত মেজর ক্যারিয়ার চট্টগ্রাম, ডিবিসিসি ঢাকা এবং ডিবিসিসি খুলনা-বরিশালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর নথি প্রকাশ করা হয়েছিল।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, টেন্ডার আটকে থাকার পেছনে মামলাকে কারণ হিসেবে দেখানো হয়। অভিযোগ আছে, খাদ্য অধিদপ্তর ও সংঘবদ্ধ ঠিকাদার সিন্ডিকেটের করা একের পর এক মামলা, আপত্তি ও আইনি জটিলতার দোহাই দিয়ে বছরের পর বছর দরপত্র ঠেকিয়ে রাখা হয়েছে। মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নতুন নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না—এমন যুক্তিতেই একই চক্র কাজ ধরে রেখেছে।
এর ফলে নতুন উদ্যোক্তারা এ খাতে ঢুকতে পারছেন না। প্রতিযোগিতা না থাকায় দর যাচাইয়ের সুযোগও নেই, অথচ সরকারি অর্থে প্রতিবছর শত শত কোটি টাকার কাজ হচ্ছে। কোথাও এর অঙ্ক হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায়।
চট্টগ্রামে ‘সাত দিনের’ মেয়াদ
হালিশহরের কেন্দ্রীয় খাদ্য সংরক্ষণাগারে (সিএসডি) শ্রম ও হস্তান্তরের ঠিকাদার মেসার্স রাজ্জাক এন্টারপ্রাইজ। নতুন দরপত্র ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটির চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
চট্টগ্রাম জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের ২০ সেপ্টেম্বরের অফিস আদেশ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির চুক্তির মেয়াদ শেষ হয় ২৩ সেপ্টেম্বর। এরপর ২৪ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত একই দর ও শর্তে কাজ চালিয়ে যেতে বলা হয়। তবে আদেশে আরেকটি শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়, নতুন ঠিকাদার নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত তারা কাজ চালিয়ে যাবে। ফলে কাগজে সাত দিনের কথা থাকলেও বাস্তবে এই ব্যবস্থা কত দিন চলবে, তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এমন শর্তের সুযোগে স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আড়ালে একটি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ সময় কাজ করে যেতে পারে।
'কেন হয়নি, বলতে পারব না'
খাদ্য অধিদপ্তর সুত্র বলছে, আইআরটিসির কাজ অন্য প্রতিষ্ঠানের কাজ থেকে আলাদা হওয়ায় ই-জিপির মাধ্যমে এর টেন্ডার সম্ভব নয়। ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে টেন্ডার করতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কমিটির অনুমোদন লাগে। সেই অনুমতি চেয়ে ইতিমধ্যে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
তথ্য প্রকাশেও ঘাটতি
খাদ্য অধিদপ্তরের নিজস্ব নথিতে দেখা যায়, ২০২০ সালের এক চিঠিতে অধিদপ্তর নিজেই স্বীকার করেছিল, আঞ্চলিক ও জেলা পর্যায়ে নিয়োগ পাওয়া ডিআরটিসি, আইআরটিসি ও আইবিসিসি ঠিকাদারদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য ওয়েবসাইটে নেই। ওই চিঠিতে এসব তথ্য প্রকাশের প্রয়োজনের কথাও বলা হয়েছিল।
প্রতিযোগিতা থাকলে ব্যয় কমে, দাবি ব্যবসায়ীদের
খাদ্যশস্য সংগ্রহ, গুদামজাত করা এবং এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে পাঠাতে প্রতিবছর বিপুল সরকারি অর্থ খরচ হয়। পরিবহন, শ্রম ও হস্তান্তর মিলিয়ে এ খাতের ব্যবসাও বড়।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন একই বা হাতে গোনা কয়েকজন ঠিকাদার কাজ পাওয়ায় প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের সুফল থেকে সরকার বঞ্চিত হতে পারে।
তাঁদের দাবি, দরপত্রে সত্যিকারের প্রতিযোগিতা থাকলে সরকারের খরচ কমানো সম্ভব। প্রতিযোগিতা সীমিত থাকলে একই গোষ্ঠী দীর্ঘদিন সুবিধা পেতে থাকে।
প্রতি ট্রাকে ‘বখশিশ’ ১৭শ!
চট্টগ্রামের হালিশহর সিএসডির হ্যান্ডলিং কাজ নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের অভিযোগ, খাদ্যশস্য পরিবহনের কাজে নিয়োজিত আইআরটিসি ও ডিআরটিসি ঠিকাদারদের কাছ থেকে ‘হ্যান্ডলিং খরচ’ বা বখশিশের নামে প্রতি ট্রাকে ১ হাজার ৭০০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। তারা বলছেন, রাজ্জাক এন্টারপ্রাইজের শ্রমিকরা এসব অর্থ আদায় করছেন।
অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমি কারও কাছ থেকে একটি টাকাও নিচ্ছি না। কেন আমার লোকজনকে ‘বকশিশ’ এর নামে টাকা দেওয়া হবে? আমি কারও কাছ থেকে কোনো টাকা নিচ্ছি কি না, তা এসে দেখার জন্য প্রতিবেদককে অনুরোধ করেন।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক শেখ রিয়াদ কামাল রনি বলেন, বর্তমানে নতুন করে ই-জিপি পদ্ধতি চালু হয়েছে। এর আগে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ঠিকাদার নিয়োগ করা হতো। ওই পদ্ধতিটিও এখনো আমাদের জন্য বলবৎ আছে। পাশাপাশি ই-জিপি পদ্ধতিতে কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। প্রায় ১৫ দিন আগে এসব নিয়মের পরিবর্তন করা হয়েছে। তবে তা এখনো অফিসিয়ালি আপডেট হয়নি। ফলে নতুন করে ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, নতুন ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া সম্ভব না হওয়ায় কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পুরোনো ঠিকাদারদের দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে। মূলত মন্ত্রণালয় থেকেই তাদের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। ইতোপূর্বে কয়েকজন ঠিকাদারের বিরুদ্ধে চাল চুরি ও বকশিশ নেওয়ার অভিযোগ থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের কোনো অভিযোগ আমার জানা নেই।
এসএ




Comments