রাজধানী ঢাকার যানজট নিরসন ও পরিবেশবান্ধব আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা জোরদার করতে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় একসঙ্গে তিনটি মেট্রোরেল প্রকল্প অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হচ্ছে। প্রস্তাবিত এই তিন মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৯ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে প্রধান মন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রকল্পগুলো চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পেশ করা হবে।
একনেকে উঠতে যাওয়া প্রকল্প তিনটি হলো—জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)-র অর্থায়নে এমআরটি লাইন-১ (বিমানবন্দর-কমলাপুর) ও এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন (হেমায়েতপুর-ভাটারা) প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয় প্রস্তাব এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ অর্থায়নে নতুন এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন (গাবতলী-দাশেরকান্দি) প্রকল্প।
পরিকল্পনা কমিশনের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, শুরুতে একনেকের মূল এজেন্ডায় কেবল এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন প্রকল্পটি উপস্থাপনের কথা ছিল। তবে পরবর্তীতে সমন্বিত অগ্রগতির কথা বিবেচনা করে এর সঙ্গে জাপানের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এমআরটি লাইন-১ ও এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ সংশোধনের প্রস্তাবও একই সভায় পেশ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
প্রস্তাবনা অনুযায়ী, জাইকার অর্থায়নে ৩১.২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-১ বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৯৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। ২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। আর ১৩.১০ কিলোমিটার পাতালপথসহ ১৭.২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা।
এমআরটি লাইন-১-এর ব্যয় বাড়ছে ১১৭.৬৪%
উপস্থাপিত সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) অনুযায়ী, দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের মূল ব্যয় ১১৭.৬৪ শতাংশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩৩ সালের মধ্যে এই প্রকল্পের যাবতীয় নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
উলেখ্য, ২০১৯ সালের ১৫ অক্টোবর একনেক সভায় প্রকল্পটি প্রথমবার অনুমোদিত হয়। তখন এর প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা—যার মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ১৩ হাজার ১১১ কোটি ১১ লাখ টাকা এবং জাইকার ঋণ থেকে ৩৯ হাজার ৪৫০ কোটি ৩২ লাখ টাকা সংস্থানের কথা ছিল। সংশোধিত ডিপিপিতে সরকারি তহবিলের জোগান ১৩৩ শতাংশ বাড়িয়ে ৩০ হাজার ৫৫২ কোটি ২৬ লাখ টাকা এবং জাপানি ঋণের অংশ ১১২.৫৩ শতাংশ বাড়িয়ে ৮৩ হাজার ৮৪২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে।
পুনর্গঠিত ডিপিপিতে উল্লেখ করা হয়, বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাবে বিস্তারিত নকশা ও দরপত্র দলিল চূড়ান্তকরণে অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্ব ঘটে। একই সঙ্গে দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল প্রকল্পের জটিল প্রক্রিয়ার কারণে ক্রয় প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সময় লেগে যায়। ফলে প্যাকেজগুলোর আর্থিক দরপত্র উন্মুক্তকরণ পিছিয়ে যাওয়ায় সার্বিকভাবে প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রকল্পটির মোট দৈর্ঘ্য ৩১.২৪১ কিলোমিটার, যার আনুষ্ঠানিক নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি। এর মধ্যে বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১৯.৮৭২ কিলোমিটার অংশ সম্পূর্ণ মাটির নিচ দিয়ে পাতাল মেট্রোরেল হিসেবে নির্মিত হবে, যেখানে থাকবে ১২টি আধুনিক পাতাল স্টেশন। অন্যদিকে, পূর্বাচল রুটটি নতুন বাজার থেকে পিতলগঞ্জ ডিপো পর্যন্ত ১১.৩৬৯ কিলোমিটার দীর্ঘ হবে, যা ৭টি উড়াল ও ২টি পাতাল স্টেশনের সমন্বয়ে গঠিত।
এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্নের ব্যয় বাড়ছে ১১৭.৮৭%
একইভাবে এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন প্রকল্পের ব্যয়ও ১১৭.৮৭ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০১৯ সালে অনুমোদিত মূল ডিপিপিতে এই প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।
পুনর্গঠিত প্রস্তাবনায় সরকারি তহবিলের বরাদ্দ ৮৪.২২ শতাংশ বাড়িয়ে ২২ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা এবং জাইকার ঋণের অংশ ১৩১.৮৯ শতাংশ বাড়িয়ে ৬৭ হাজার ৫১৮ কোটি টাকা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই করিডোরটিতে হেমায়েতপুর থেকে আমিনবাজার অংশটি উড়াল (এলিভেটেড) এবং আমিনবাজার থেকে ভাটারা অংশটি পাতাল (আন্ডারগ্রাউন্ড) হিসেবে নির্মিত হবে। প্রকল্পটি পূর্বে ২০২৮ সালের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা থাকলেও নতুন প্রস্তাবে সময়সীমা বাড়িয়ে ২০৩২ সাল নির্ধারণ করা হয়েছে।
এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্নে ব্যয় ৪৫,৫০৩ কোটি টাকা
নতুন অনুমোদন পেতে যাওয়া গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ১৫ হাজার ১৯৭ কোটি ৬৬ লাখ ৪৭ হাজার টাকা এবং এডিবি ও দক্ষিণ কোরিয়ার ইডিসিএফ (EDCF) থেকে যৌথ প্রকল্প ঋণ হিসেবে ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি ১০ লাখ ২৩ হাজার টাকা সংস্থান করা হবে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩৩ সালের আগস্টের মধ্যে এর অবকাঠামোগত নির্মাণকাজ শেষ করার কথা রয়েছে।
এই রুটটি গাবতলী থেকে শুরু হয়ে টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজ গেট, আসাদ গেট, শুক্রাবাদ, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল, তেজগাঁও, আফতাবনগর, আফতাবনগর সেন্টার ও আফতাবনগর পূর্ব হয়ে নাসিরাবাদ ও দাশেরকান্দি পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ১৭.২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই রুটে গাবতলী থেকে আফতাবনগর পর্যন্ত ১৩.১০ কিলোমিটার হবে পাতাল এবং আফতাবনগর থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ৪.১০ কিলোমিটার নির্মিত হবে উড়ালপথ হিসেবে।
প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির ব্যয় ৫৪ হাজার ৬১৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা ধরা হলেও একাধিক পর্যালোচনার পর তা কমিয়ে ৪৫,৫০৩ কোটি টাকায় আনা হয়েছে। প্রকল্পে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা এডিবি কনসালট্যান্সি ও সিভিল প্যাকেজে অর্থায়ন করবে এবং কো-ফাইন্যান্সার হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়া রেলওয়ে সিস্টেম প্যাকেজে ঋণ দেবে। ঢাকার পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তকে সরাসরি যুক্ত করার পাশাপাশি এটি রাজধানীর দীর্ঘদিনের তীব্র যানজট নিরসনে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।
ডিআর




Comments