Image description

জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ায় নতুন করে চাপে পড়েছে দেশের সাধারণ মানুষ। এমনিতেই আয় কমা, কর্মসংস্থানের সংকট ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন অনেকে। এর মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহণ, কৃষি, শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ প্রায় সব খাতেই ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব ধীরে ধীরে পণ্য ও সেবার দামে পড়বে। এতে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যেতে পারে। সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়বেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ।

অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধাক্কা। এর প্রভাব কৃষি, শিল্প ও সেবাসহ অর্থনীতির সব খাতেই পড়বে। পরিবহণ ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি কৃষিপণ্য, শিল্পপণ্য ও বিভিন্ন সেবার দামও বাড়তে পারে।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহণ, সেচ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও কারখানা পরিচালনার খরচ বাড়ে। এর একটি অংশ উৎপাদক ও ব্যবসায়ীরা ভোক্তার ওপর চাপাতে পারেন। ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়ার পাশাপাশি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যেতে পারে।

বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর রাজধানীর খুচরা বাজারে কয়েক ধরনের সবজির দাম কেজিতে ৫ থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বেশির ভাগ সবজি এখন ৮০ টাকার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। কিছু সবজির দাম ১০০ টাকা ছাড়িয়েছে।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব ভোজ্যতেলের বাজারেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে নিত্যপণ্যের বাজারে সাধারণ ক্রেতাদের ওপর আরও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাড়ছে পরিবহণ ব্যয়

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর গণপরিবহণের ভাড়া বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে রাইড শেয়ারিংয়ের ক্ষেত্রেও বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

সোমবার রাজধানীতে মোটরসাইকেল রাইড শেয়ারিংয়ে আগে ১৫০ টাকা ভাড়ার যাত্রায় ২০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার ঘটনা দেখা গেছে। কোথাও কোথাও ২০০ টাকার ভাড়া ২২০ থেকে ২৩০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।

চাপে শিল্প খাত

দেশের শিল্প খাত এমনিতেই বিনিয়োগ ও উৎপাদন সংকটে রয়েছে। নতুন জ্বালানি ব্যয় যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

গার্মেন্ট, টেক্সটাইল, সিমেন্ট, স্টিল, সিরামিকসহ বিভিন্ন শিল্পে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও ডিজেলের প্রয়োজন হয়। জ্বালানির দাম বাড়ায় উৎপাদন ও পরিবহণ ব্যয় বাড়বে। এতে উৎপাদিত পণ্যের দাম বাড়ার পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিস্থিতি এমনিতেই খারাপ। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় অভ্যন্তরীণ চাহিদা আরও কমতে পারে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে অনেক কারখানা ইতোমধ্যে বন্ধ হয়েছে, নতুন করে আরও কারখানা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কৃষিতেও বাড়বে খরচ

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির বড় প্রভাব পড়বে কৃষিতে। বিশেষ করে ডিজেলচালিত সেচ পাম্পে খরচ বাড়বে। এতে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি কৃষিপণ্যের দামও বাড়তে পারে।

সেচের পাশাপাশি কৃষিপণ্য পরিবহণেও বাড়তি ব্যয় যুক্ত হবে। ফলে শেষ পর্যন্ত এর চাপ ভোক্তার ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাড়তে পারে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়

তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ব্যয়ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে বেড়ে যাবে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারের ব্যয় বাড়তে পারে।

বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কমাতে উৎপাদন কমানো হলে বিদ্যমান লোডশেডিং আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে। আবার ভর্তুকির চাপ কমাতে ভবিষ্যতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সব মিলিয়ে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু পরিবহণ খাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ ও বিভিন্ন সেবার ব্যয় বাড়ার মাধ্যমে এর চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় গিয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এসএস