সংবিধানের মৌলিক কাঠামোসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। এসব সংশোধনী নিয়ে আবারও গণভোট আয়োজনের চিন্তাভাবনা চলছে। আগামী ডিসেম্বরে সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটি প্রতিবেদন জমা দিতে পারে। এরপর জানুয়ারিতে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সংশোধনী বিল উত্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটির সঙ্গে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক ও সাংবাদিক সংগঠনের নেতাদের বৈঠকে এসব তথ্য জানানো হয়।
বৈঠকে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, একই ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন না করা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব উঠে আসে। পাশাপাশি বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংশোধনী প্রণয়নের পরামর্শ দেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন কয়েকজন সাংবাদিক।
বৈঠকে বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে কমিটির সদস্য, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদকরা অংশ নেন। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে বৈঠক চলে।
বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে গণভোটের বিধান পুনর্বহালের বিষয়টি সংশোধনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। আওয়ামী লীগ সরকারের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এ বিধান বাদ দেওয়া হয়েছিল। অভ্যুত্থানের পর উচ্চ আদালতের আদেশে তা পুনর্বহালের বিষয়টি সামনে এসেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধানের প্রস্তাবনা, ৪৮ ও ৫৬ অনুচ্ছেদসহ নির্দিষ্ট কিছু বিধানে সংসদ পরিবর্তন আনলে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে গণভোট আয়োজন করতে হবে। তবে পুরো সংশোধনী বিলের ওপর গণভোটের প্রয়োজন হবে না। যেসব অনুচ্ছেদ সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোট সাংবিধানিকভাবে বাধ্যতামূলক, শুধু সেগুলোর জন্যই এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।
তিনি জানান, ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাসহ আরও দুটি অনুচ্ছেদ যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছিল। এসব বিধানে ভবিষ্যতে পরিবর্তন আনতে হলেও সাংবিধানিকভাবে গণভোটের প্রয়োজন হতে পারে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিশেষ কমিটি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপন করতে চায়। এরপর আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সংশোধনী বিল তৈরি করবে। আগামী বছরের জানুয়ারিতে সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিলটি উত্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
সংবিধান সংশোধনে জুলাই জাতীয় সনদ ও বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের মধ্যে কোনটি অগ্রাধিকার পাবে, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পাশাপাশি নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরিত বিষয়গুলো সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। এর বাইরে ঐকমত্যের আলোচনায় বাদ পড়া বিষয়গুলোও আলোচনার মাধ্যমে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন নেই, এমন বিষয় আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বাস্তবায়নের বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।
বিরোধী দলের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিশেষ কমিটিতে যোগ দিতে বিরোধী দলকে একাধিকবার আহ্বান জানানো হয়েছে। তারা অংশ নিলে তাদের প্রস্তাব ও মতামত বিবেচনা করে গ্রহণযোগ্য বিষয়গুলো সংশোধনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তবে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ক্ষমতা সরকারের নেই; শুধু আহ্বান জানানো সম্ভব।
বৈঠকে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা সংবিধান সংশোধনে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। তারা বলেন, জুলাইয়ের পরিবর্তনের পর সব রাজনৈতিক দল ও মতের প্রতিনিধিদের মতামতের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন করা প্রয়োজন। অংশীজনদের মতামত যেন বাস্তব সংশোধনীতে প্রতিফলিত হয়, সে বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন তারা।
বৈঠকে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধানের পদ পৃথক করার প্রস্তাব দেন কয়েকজন সম্পাদক। এ ছাড়া দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব, সুপ্রিম কোর্টের বিকেন্দ্রীকরণ, ন্যায়পাল নিয়োগ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়েও আলোচনা হয়।
একজন সম্পাদক তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির ভূমিকা এবং বিচার বিভাগকে এ ব্যবস্থার বাইরে রাখার বিকল্প নিয়েও ভাবনার পরামর্শ দেন। অন্যদিকে, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের প্রয়োজনীয়তা ও এর ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন তোলেন একজন সাংবাদিক।
একটি ইংরেজি দৈনিকের সম্পাদক সংবিধান সংশোধনের জন্য সাংবিধানিক কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব দেন। তাঁর মতে, শুধু নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মতামত নিশ্চিত করতে গণভোটের আয়োজন করা প্রয়োজন।
এসএস




Comments