বিলিয়ন ডলারের চলচ্চিত্রে শিল্পের বড় অংশজুড়ে রয়েছে প্রযুক্তি। হলিউডের কোটি কোটি টাকার সিনেমায় থাকে চোখ ধাঁধানো সব গ্রাফিক্স ও অ্যানিমেশন। বাস্তবতা ও কৃত্রিমতার এক মিশেল আমাদের নিয়ে যায় অন্য দুনিয়ায়। সৃজনশীলতার এই অসাধ্য সাধনে এখন অনেকাংশেই ব্যবহৃত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)।
বিশ্বজুড়ে এআই নিয়ে আলোচনা যখন তুঙ্গে, বিগ বাজেট সিনেমাগুলো তখন এআই ব্যবহার করে যেন সেই আলোচনাকেই আরও উসকে দিচ্ছে। মার্ভেল সিনেম্যাটিক ইউনিভার্সের সিনেমা থেকে শুরু করে জেমস ক্যামেরনারে অ্যাভাটার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার রয়েছে সর্বত্রই। আর এই চলচ্চিত্রগুলো সাদরে গ্রহণ করছেনও দর্শকরা।
অ্যাভাটার সিনেমা ফ্রাঞ্চাইজির দ্বিতীয় কিস্তি দ্য ওয়ে অব ওয়াটারের প্রায় পুরোটা জুড়েই রয়েছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রযুক্তির ব্যবহার। প্রত্যেক সিনকে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সাহায্যে বিশেষভাবে মডিফাই করা হয়েছে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের অ্যালগোরিদমের সাহায্যে সিনেমার গল্প ও স্ক্রিপ্ট পুনরায় সাজানো হয়েছে। গল্পের মোড় ঘোরানোর মতো পরিবর্তন করতেও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বিশেষ সহায়তা করেছে পুরো সিনেমায়।
আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সেই সঙ্গে গল্পের চরিত্রের এক্সপ্রেশনের সঙ্গে কম্পিউটারের মধ্যে সেগুলোর মডিফিকেশনেও বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছে সিনেমাজুড়ে।
অ্যাভেঞ্জার্স: ‘এন্ডগেম’ এবং ‘দ্য লায়ন কিং’ চলচ্চিত্রগুলোয় ব্যবহৃত মুখের অ্যানিমেশন প্রযুক্তি মানুষের অভিব্যক্তি এবং নড়াচড়ার অনুকরণ করতে মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম ব্যবহার করা হয়েছে। এআইয়ের ব্যবহারে এই চলচ্চিত্রগুলো অনেক বাস্তবসম্মতভাবে তৈরি হয়েছে এবং দর্শককে বিমোহিত করছে। বড় পর্দায় তারকাদের বয়স কমিয়ে আনছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি। ৮০ বছর বয়সি হ্যারিসন ফোর্ডের তার বর্তমান চেহারা নিয়ে ‘ইন্ডিয়ানা জোনস’ সিনেমার প্রধান চরিত্রে অভিনয় হয়তো অসম্ভব ছিল। কিন্তু ট্রেইলারে ঠিকই আগের মতোই ঝলমলে চেহারায় ধরা দিয়েছেন হ্যারিসন। আর এর পেছনে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির কারসাজি। রবার্ট জেমেকিসের নতুন সিনেমা ‘হেয়ার’- এ টম হ্যাংকস, রবিন রাইটসহ আরও যেসব অভিনেতার নিজেদের বয়সের চেয়ে তরুণ দেখানোর প্রয়োজনে তাদের ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তির সুবিধা নেওয়া হয়েছে।
২০১৯ সালে ‘ক্যাপ্টেন মার্ভেল’ চলচ্চিত্রে স্যামুয়েল এল জ্যাকসনের বয়স প্রায় ২৫ বছর কমিয়ে আনা হয়েছিল। কারণ দর্শকরা চান তাদের অতি পরিচিত অভিনেতাই বারবার চলচ্চিত্রে থাকুক, যাতে করে ওই আবেদন থেকে তারা বিচ্ছিন্ন না হয়ে যান।
তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারের কারণে সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে। সম্প্রতি মার্ভেল স্টুডিওস থেকে মুক্তি পাওয়া সিক্রেট ইনভেনশনে এআইয়ের ব্যবহারের সমালোচনা করছেন অনেকে। দর্শকরা বলছেন গ্রাফিক্স ডিজাইনার ও অ্যানিমেটরদের কার্যকারিতা ও জীবিকা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। ইতিমধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারের প্রতিবাদ জানিয়ে আন্দোলন করছেন হলিউডের চলচ্চিত্রে অনেক কর্মী।
যন্ত্র মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে-এ আশঙ্কা শতাব্দীপ্রাচীন। এখন পর্যন্ত নতুন প্রযুক্তি নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। যন্ত্র কিছু কাজ করতে পারে। তবে সব কাজ পারে না। তাই যন্ত্র যেসব কাজ পারে না, সে ক্ষেত্রে কর্মীর চাহিদা বেড়েছে। বাস্তবতা হচ্ছে, চলচ্চিত্র নির্মাণে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এআই ব্যবহার করা হলেও, এটি এখনও এ শিল্পে অপেক্ষাকৃত নতুন প্রযুক্তি। কাজেই এর সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। চলচ্চিত্র নির্মাণের সৃজনশীল সিদ্ধান্তগুলো শেষ পর্যন্ত মানুষের ইনপুটের ওপরই নির্ভর করে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রক্রিয়াটিকে সহায়তার জন্য হাতিয়ার মাত্র।
ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে এআইয়ের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতার কারণে বিষয়বস্তুর মান, সৃজনশীলতা এবং মৌলিকত্ব হারাতে পারে। দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার না করলে এটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন-সৃজনশীলতা এবং মৌলিকত্বের অভাব হতে পারে। সে ক্ষেত্রে শুধু প্রি-প্রোডাকশন কিংবা চিত্রনাট্য তৈরিতে এআইয়ের সহায়তা নেওয়ার কথা বলছেন বিশ্লেষকরা। তবে নতুন এই প্রযুক্তি সিনেমাবাজারকে কোথায় নিয়ে যায়
তা এখনই বলা যাচ্ছে না।




Comments