প্রায় দুই বছর ধরে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বিশেষ করে ডলারের তীব্র সংকটের কারণে অর্থনীতি বিরাট হুমকির মুখে অবস্থান করছে। সেই সাথে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম লাগামহীন বৃদ্ধি প্রধান প্রধান শিল্প উৎপাদন খাতে ও আমদানির উপরে কড়াকড়ি বিভিন্ন জটিল সমীক্ষার সম্মুখীন হচ্ছে অর্থনীতিসহ দেশের সর্বস্তর। পাশাপাশি পর্যাপ্ত ডলার না থাকার কারণে অনেক বড় বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আমদানিতে লেটার অর্থনীতিতে শুরু করে আমদানি না করতে পারার বিপাকে পড়ছে আমদানিকারকরা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ৯৮ শতাংশই ডলারে সম্পন্ন হয়ে থাকে। তাই আন্তর্জাতিক লেনদেন গতিপ্রকৃতি ডলারই নির্ধারণ করে। এই গতিপ্রকৃতির দুর্দিনে ডলার চাপ কমাতে আমদানি ঋণপত্র খোলার, বিকল্প মুদ্রা হিসেবে এলসি চালুসহ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও তেমন আশানুরূপ ফলাফল একদমই আসেনি। এছাড়াও ডলার সংকট উত্তরণের সহায়ক হিসেবে বরাবরই রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় বিশেষ একটি ভূমিকা রেখে আসছে।
কিন্তু ইদানিং প্রবাসী কল্যাণ ও বিদেশি কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরের সব মিলিয়ে ১০ লাখ ৭৪ হাজার কর্মী বিদেশে গেছেন যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ এবং খুবই দুঃখজনক। এহেন পরিস্থিতি থেকে অর্থনীতিকে বাঁচাতে হলে এবং আমাদের দেশের প্রধান প্রধান রপ্তানিমুখী শিল্পসমূহের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি।
বহুমুখী রপ্তানি বৃদ্ধি এই মুহূর্তে পারবে এ বিপদ থেকে আশার আলো জ্বালাতে। বাংলাদেশে এমন প্রচুর পণ্য আছে যা রপ্তানি যোগ্য এবং এসব পণ্যের বাইরের দেশগুলোতে প্রচুর চাহিদা রয়েছে। সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে রপ্তানি খাতসমূহকে সমৃদ্ধ করতে পারলে দেশের ডলার সংকট অনেকাংশে ত্বরান্বিত হবে।
বাংলাদেশের প্রধান প্রধান অগ্রাধিকারযোগ্য রপ্তানি খাতসমূহ যেমন সর্বাগ্রে পোশাক শিল্প, ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্য, বিভিন্ন প্লাস্টিক পণ্য, চামড়া ও অচামড়াজাত এবং সিনথেটিক পণ্য, বিভিন্ন এগ্রোপ্রোডাক্টস পণ্য, ফার্নিচার এবং হোম ফারনিশিং ইত্যাদিতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করে রপ্তানি এলাকাগুলোকে সমৃদ্ধ করা এখন আমাদের সময়ের দাবি। বহুমুখী পোশাক ও পাট জাত শিল্প আমাদের রপ্তানি খাতে শীর্ষ অবস্থানে আছে বিশেষ নজর দিয়ে রপ্তানি বৃদ্ধি করে ডলার উপার্জনের এখন বিকল্প নেই।
এছাড়া ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প আমাদের দেশে আকর্ষণীয় অবস্থানে আছে। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের পণ্যগুলো দেখতে যেমন আকর্ষণীয় তেমনি ব্যবহারেও আরামদায়ক। কিন্তু হতাশার ব্যাপার এই যে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অবহেলার কারণে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সেই সেকেলে মত বৈদেশিক পর্যায়ে ততটা সারা জাগাতে পারছে না। যদি ক্ষুদ্র কুটির শিল্প খাতে আমাদের দেশি মুদ্রায় বিনিয়োগ করে পণ্যগুলো বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া যায় তবে আন্তর্জাতিক বাজারে যেমন আমাদের নিজস্ব পণ্য লেনদেন হলো পাশাপাশি ডলার আমদানি হবে।
উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের তাঁত শিল্প সবচেয়ে বড় কুটির শিল্প। ফ্রিতে পণ্য লাগামহীনভাবে অন্যদেশে না পাঠিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে এখন সময় এ অনন্য শিল্পকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসার মাধ্যমে অর্থনীতির অবস্থান সচল করা। বর্তমানে আমরা বিশ্বের সচল অর্থনীতির দেশগুলোর দিকে তাকালে সহজেই অনুধাবন করতে পারি তারা কিভাবে নিজেদের দেশীয় পণ্য রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। কিন্তু আমাদের দেশে দেশীয় মুদ্রাকে আটকে রাখার ফলে বিনিয়োগ হচ্ছে না। পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না করার কারণে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে গোটা অর্থনীতি।
আমাদের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা ও ডলার সংকট নিরসনে আমাদের রপ্তানি পণ্যের দিকে বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন। হুমকিতে পড়ে থাকা অর্থনীতিকে স্থবির অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে রপ্তানি খাতসমূহকে বৃদ্ধি করা এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করার কোনো বিকল্প নেই। ডলার সংকট মোকাবিলা সরকারের পক্ষ থেকে বৃহৎ আকারে উদ্যোগ গ্রহণ আরো বেশি জরুরি। অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে উৎপাদন পূর্বের চেয়ে তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি করতে হবে। বিনিয়োগ অধিক পরিমাণে করলে আশানুরূপ ফলাফল পাওয়া যাবে।
সুতরাং এ ব্যাপারে সক্ষম ব্যক্তিদের বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি। তবেই আমরা ডলারের এ সংকটকে কাটিয়ে উঠতে পারব।
লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
মানবকণ্ঠ/এফআই




Comments