ভিডিও ফাঁসের হুমকি দিয়ে নারীকে ব্ল্যাকমেইল, গ্রেপ্তার ৬
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার ভূজপুর থানায় এক নারীর ব্যক্তিগত নগ্ন ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বুধবার তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।
ভূজপুর থানার মামলা নম্বর–০২ (তারিখ: ৯ মার্চ ২০২৬) অনুযায়ী, পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১২-এর ৮(১), ৮(২), ৮(৩) ও ৮(৫)(ক) ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়েছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী রত্না দে (৪৫) চার সন্তানের জননী। তার ছেলে বিজয় দে (২১) বর্তমানে ওমান প্রবাসী। প্রায় দুই থেকে আড়াই বছর আগে ছেলে দেশে থাকাকালে প্রধান আসামি দেবাশিষ চক্রবর্তী ওরফে আশিষ (২৬) তার সঙ্গে পরিচয়ের সূত্রে প্রায়ই তাদের বাড়িতে যাতায়াত করত। সেই সুযোগে প্রায় দুই বছর আগে কৌশলে ভুক্তভোগীর ব্যবহৃত মোবাইল ফোন থেকে তার ব্যক্তিগত কিছু নগ্ন ছবি ও ভিডিও গোপনে নিজের মোবাইলে সংরক্ষণ করে বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে এসব ছবি ও ভিডিও অন্য আসামিদের মধ্যেও শেয়ার করা হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে স্থানীয় কয়েকটি সূত্রের দাবি, আশিষের সঙ্গে রত্না দে’র আগে থেকেই ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল বলে এলাকায় আলোচনা রয়েছে। পরবর্তীতে সম্পর্কের অবনতি ঘটলে আশিষ ভিডিও দেখিয়ে তাকে বিভিন্ন সময় ব্ল্যাকমেইল করত। একপর্যায়ে রত্না দে তার ডাকে সাড়া না দিলে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে তার কাছ থেকে টাকা আদায়ের চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্র আরও দাবি করেছে, তাদের মধ্যে আগে থেকেই কিছু আর্থিক লেনদেনও ছিল।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট সকাল ১১টা থেকে বিভিন্ন সময়ে ভুয়া ফেসবুক আইডি ব্যবহার করে ভুক্তভোগীর পরিবারকে ভিডিও ও ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে।
পরিবারের সম্মান রক্ষার্থে ভুক্তভোগীর মেয়ে কেয়া দে (২৬) বিকাশের মাধ্যমে প্রথমে ৫০ হাজার টাকা দেয়। পরে আবার ভুয়া ফেসবুক আইডি থেকে ওমান প্রবাসী ছেলে বিজয় দে’র ফেসবুক মেসেঞ্জারে নগ্ন ছবি ও ভিডিও পাঠিয়ে আরও ২০ হাজার টাকা আদায় করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এরপর গত ৭ মার্চ ২০২৬ রাত আনুমানিক ১০টার দিকে প্রধান আসামি দেবাশিষ চক্রবর্তী ভুক্তভোগীর বাড়িতে গিয়ে তার মোবাইলে সংরক্ষিত ভিডিও দেখিয়ে আবারও ৪০ হাজার টাকা দাবি করে। ভুক্তভোগী টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে আসামি হুমকি দেয় যে, তার ব্যক্তিগত ভিডিও ও ছবি অন্যান্য আসামিদের কাছেও রয়েছে এবং সেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জানান, ভুক্তভোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে ভূজপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নির্দেশে মামলা রুজু করা হয়। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে ৯ মার্চ ভোর ৪টা ১০ মিনিট থেকে সকাল ৭টা ৩৫ মিনিটের মধ্যে ভূজপুর থানার বিভিন্ন এলাকা থেকে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন— দেবাশিষ চক্রবর্তী ওরফে আশিষ (২৬), জিকু দে (২৩), এনি দে (২৩), জয় দে (২৩), ইমন শীল (২১) ও মো. শাকিল (২৩)।
গ্রেপ্তারের পর তাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন যাচাই করে কয়েকজনের মোবাইলে ভুক্তভোগীর নগ্ন ছবি ও ভিডিও সংরক্ষিত থাকার তথ্য পাওয়া যায়। এ সময় দেবাশিষ চক্রবর্তীর ব্যবহৃত একটি চঙঈঙ গ২, জিকু দে’র একটি রচযড়হব ১১ এবং মো. শাকিলের একটি জবফসর ১১ মডেলের মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে।
তবে এ ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া কয়েকজনের পরিবার দাবি করেছেন, মূল ঘটনার সঙ্গে তাদের স্বজনদের সম্পৃক্ততা নেই। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার মূল ব্যক্তি আশিষ এবং নিজেকে রক্ষার জন্য সে অন্যদের নাম জড়িয়েছে। পরিবারের সদস্যরা বলেন, কারও মোবাইলে ভিডিও পাওয়া গেলেই তাকে জড়ানো হয়েছে, অথচ বাস্তবতা ভিন্ন হতে পারে।
এদিকে ভুক্তভোগী রত্না দে বলেন, তিনি মূলত আশিষের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। অন্যদের গ্রেফতারের বিষয়টি পুলিশের তদন্তের ওপর নির্ভর করছে এবং কেন তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্টভাবে কিছু বলতে পারেননি।
অন্যদিকে অভিযুক্তদের একজনের পরিবারের দাবি, পারিবারিক বিরোধের জেরে তাদের স্বজনকে একটি পক্ষ পরিকল্পিতভাবে মামলায় জড়িয়েছে। তারা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রত্না দে কাজিরহাট বাজারের একটি টেইলারিং দোকানে কাজ করতেন। চার সন্তানের এই জননীর সঙ্গে অতীতেও এলাকায় কয়েকবার পারিবারিক ও সামাজিক বিরোধের ঘটনা ঘটেছিল বলে এলাকাবাসীর কেউ কেউ জানিয়েছেন।
ভূজপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিপুল দে বলেন, নারীর ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল করে অর্থ আদায়ের অভিযোগে মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে এবং মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।




Comments