Image description

গাইবান্ধার ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার বুকে জেগে ওঠা বালুচরগুলো এখন টকটকে লাল রঙে রঙিন। দূর থেকে দেখে মনে হয় যেন দিগন্তজোড়া লাল কার্পেট বিছানো হয়েছে। কৃষকদের ঘাম আর পরিশ্রমে ফলানো এই লাল মরিচ এখন শুধু একটি ফসল নয়, বরং জেলার অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী স্তম্ভ এবং গাইবান্ধার অন্যতম প্রধান ব্র্যান্ডিং পণ্য।

গাইবান্ধাকে দেশব্যাপী পরিচিত করতে জেলা প্রশাসন তিনটি পণ্যকে ব্র্যান্ডিং হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে—রসমঞ্জুরী, চরাঞ্চলের ভুট্টা ও লাল মরিচ। জেলার প্রচলিত স্লোগান—‘স্বাদে ভরা রসমঞ্জুরীর ঘ্রাণ, চরাঞ্চলের ভুট্টা-মরিচ গাইবান্ধার প্রাণ’—এখন চরের মানুষের মুখে মুখে। ২০১৮ সালে মরিচকে জেলা ব্র্যান্ডিং পণ্য হিসেবে স্বীকৃতির পর এর চাষাবাদ ও বাজার ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।

গাইবান্ধা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ১ হাজার ৯৫৬ হেক্টর জমিতে মরিচ চাষ হয়েছে। সবচেয়ে বেশি চাষ হয়েছে নদীবেষ্টিত ফুলছড়ি উপজেলায় (৯২০ হেক্টর)। এ বছর জেলায় ৫ হাজার ৪০৯ মেট্রিক টন মরিচ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সোমবার (১৫ জুন) সরেজমিনে ফুলছড়ির খাটিয়ামারি, নিশ্চিতপুর, কাউয়া বাজার ও উরিয়ার রতনপুর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, চরের নারী-পুরুষেরা দল বেঁধে মাঠ থেকে মরিচ সংগ্রহ করছেন। কোথাও চলছে ঝুড়িতে সাজানোর কাজ, কোথাও নদীর পাড়ে বালুচরে চলছে শুকানোর ধুম।

চরের কৃষক ফুল মিয়া জানান, বিঘা প্রতি মরিচ উৎপাদনে খরচ হয় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা। ফলন ভালো হলে ১০ থেকে ১৪ মণ মরিচ পাওয়া যায়। বর্তমান বাজারে প্রতি মণ মরিচ প্রায় ১২ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, যা কৃষকদের জন্য বেশ লাভজনক। আরেক কৃষক হযরত আলী বলেন, "এই মরিচই আমাদের রুটি-রুজি। এবার আবহাওয়া ভালো থাকায় ফলন ও দাম দুই-ই ভালো পাচ্ছি।"

চরের উৎপাদিত এই মরিচের প্রধান বাজার হলো ঐতিহ্যবাহী ফুলছড়ি হাট। সপ্তাহে শনি ও মঙ্গলবার বসা এই হাটে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা আসেন। হাটের ইজারাদার অহিদুল ইসলাম জানান, প্রতিটি হাটবারে সোয়া কোটি থেকে দুই কোটি টাকার মরিচ বেচাকেনা হয়। তবে কৃষকদের দীর্ঘদিনের দাবি— চরাঞ্চলে একটি আধুনিক সংরক্ষণাগার বা হিমাগার স্থাপন করা। এতে মৌসুম শেষে ভালো দামে মরিচ বিক্রির সুযোগ তৈরি হবে। এছাড়া বালুচরে পণ্য পরিবহনে যাতায়াত কষ্টসাধ্য হওয়ায় চরভিত্তিক বিশেষ বাজার ব্যবস্থার দাবিও উঠেছে।

গাইবান্ধা কৃষি বিভাগের উপ-পরিচালক সাদেকুল ইসলাম বলেন, "এখানকার মরিচের মান অত্যন্ত ভালো হওয়ায় দেশের নামি-দামি মসলা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে এর বিশেষ চাহিদা রয়েছে। কৃষকদের উন্নয়নের লক্ষে চরাঞ্চলে ক্রয় কেন্দ্র ও সংরক্ষণাগার নির্মাণের বিষয়টি সরকারকে অবগত করা হবে।"

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) যাদব সরকার বলেন, "গাইবান্ধার চরাঞ্চলের কৃষকরা আমাদের অর্থনীতির বড় শক্তি। তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো বিশেষ করে সংরক্ষণাগারের বিষয়টি আমরা উচ্চপর্যায়ে জানাব এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব।"

মানবকণ্ঠ/ডিআর