গণতন্ত্রের সংগ্রাম হোক স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতার পক্ষে,নতুন কর্তৃত্ববাদের নয়
গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার সংগ্রাম একটি জাতির রাজনৈতিক অগ্রযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গণতন্ত্র কেবল ভোটাধিকার প্রয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি কথা বলার, সমালোচনা করার এবং ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। এই সংগ্রামের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগণের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
যখন স্থিতিশীলতার নামে মতপ্রকাশের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়, তখন গণতন্ত্রের আত্মাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জবাবদিহিতা মানে ক্ষমতার অধিকারীদের জনগণের প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার বাধ্যবাধকতা। কিন্তু ইতিহাসের অভিজ্ঞতা দেখায়, কখনো কখনো গণতন্ত্রের নামে পরিচালিত আন্দোলন বা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া নতুন ধরনের কর্তৃত্ববাদী কাঠামো তৈরির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
গণতান্ত্রিক আবরণ বজায় রেখেও কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা প্রকাশ পেতে পারে। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, কিন্তু বিরোধী মত দমনে আইন ব্যবহৃত হয়; গণমাধ্যম থাকে, কিন্তু স্বাধীন সাংবাদিকতা ভয়ের মধ্যে পরিচালিত হয়; সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংখ্যালঘু মতকে উপেক্ষা করা হয়। এই পরিস্থিতিকেই প্রায়ই “নির্বাচনী কর্তৃত্ববাদ” বা illiberal democracy বলা হয়।
গণতন্ত্রের সংগ্রামের প্রধান ভিত্তি
১. আইনের শাসন: ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নয়, প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে সরকার পরিবর্তন হলেও নাগরিক অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকে।
২.নাগরিক পরিসরের সুরক্ষা: বিশ্ববিদ্যালয়, গণমাধ্যম, নাগরিক সংগঠন ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
৩.ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ: সব সিদ্ধান্ত একটি কেন্দ্রে সীমাবদ্ধ থাকলে জবাবদিহিতা দুর্বল হয়। স্থানীয় সরকার ও তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করতে হবে।
৪. রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়ন: প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, গণতান্ত্রিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে গ্রহণ করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। “আমরা বনাম ওরা” ধরনের বিভাজনমূলক রাজনীতি কর্তৃত্ববাদের পথ সুগম করে।
স্বাধীনতা ছাড়া জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হয় না, আবার জবাবদিহিতা ছাড়া স্বাধীনতাও দীর্ঘস্থায়ী হয় না। এই দুটি উপাদান অনুপস্থিত থাকলে যে ব্যবস্থা টিকে থাকে, তা কেবল গণতন্ত্রের নামধারী এক নতুন রূপের কর্তৃত্ববাদে পরিণত হতে পারে।
সত্যিকারের গণতান্ত্রিক পরিবেশে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নয়, বরং ক্ষমতার ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা জরুরি। বিচারব্যবস্থা, গণমাধ্যম, নির্বাচন ব্যবস্থা এবং নাগরিক সমাজ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারলে গণতন্ত্র আরও সুদৃঢ় হয়। একই সঙ্গে নাগরিকদের মতামত প্রকাশের অধিকার, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গণতন্ত্রের সংগ্রাম তাই কেবল শাসক পরিবর্তনের প্রশ্ন নয়; এটি একটি মূল্যবোধভিত্তিক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় স্বাধীনতা, জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা নিশ্চিত না হলে গণতন্ত্রের প্রকৃত লক্ষ্য অর্জিত হয় না। বরং তখন নতুন কোনো গোষ্ঠী বা শক্তি ক্ষমতার কেন্দ্রে এসে আবারও কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা সৃষ্টি করতে পারে।
মানবকণ্ঠ/ডিআর




Comments