Image description

নরসিংদীর অতি গুরুত্বপূর্ণ ‘রায়পুরা-নরসিংদী-মদনগঞ্জ আঞ্চলিক সড়ক’ ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। তাঁতশিল্পের গৌরব, শিল্পসমৃদ্ধ অর্থনীতি আর লটকন-কলাসহ সুস্বাদু ফলের জন্য দেশজুড়ে পরিচিত এক জেলা নরসিংদী।

সড়কটি আজ চরম অবহেলা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার তীব্র সংকট এবং ভাঙাচোরা অবকাঠামোর এক নির্মম প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নরসিংদী পৌর শহরের সব ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে এই সড়কের উভয় পাশে। দীর্ঘদিন ধরে সড়কের দুই ধারে ময়লা ফেলার কারণে এখন তা বিশাল স্তূপে পরিণত হয়েছে। দেখতে মনে হবে কোনো পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে কেটে সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। অধিকাংশ স্থানে এই ময়লা উপচে সরাসরি মূল সড়কে এসে পড়ছে। এর ফলে সড়কে বৃষ্টির পানি ও তরল বর্জ্য জমে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় মরণফাঁদ বা বিশাল গর্তের। এই চরম অব্যবস্থাপনার কারণে সড়কটিতে প্রতিনিয়ত ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। উল্টে যাচ্ছে যাত্রীবাহী যানসহ গ্রে-কাপড়বাহী পিকআপভ্যান-নছিমন। এতে গ্রে-কাপড়ে লাগছে ‘আলকাতরার মত রঙের ময়লার পানি’। যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে টেক্সটাইল মালিকরা। ধস নামছে স্থানীয় টেক্সটাইল ব্যবসায়। পাশাপাশি বাতাসে ছড়াচ্ছে ময়লার তীব্র দুর্গন্ধ। ফলে সড়কটি দিয়ে চলাচলকারী যাত্রী, চালক এবং দুপাশের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের প্রতিনিয়ত দম বন্ধ করা পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী ও শিশুরা।

চৌয়ালা এলাকার শাহজাহান সরকার নামে একজন টেক্সটাইল মিলের মালিক বলেন, গাড়ি উল্টে কাপড়ের বান্ডিলগুলো সরাসরি সড়কের নোংরা, কালো ও দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে পড়ে যাচ্ছে। ময়লার এই পানি কাপড়ে লেগে আলকাতরার মতো দাগ তৈরি করছে, যা আর কোনোভাবেই পরিষ্কার করা সম্ভব হয় না। এর ফলে প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে থরে থরে সাজানো সাদা কাপড়ের বেল। এতে টেক্সটাইল মালিকদের গুনতে হচ্ছে লাখ লাখ টাকার লোকসান।

টেক্সটাইল ব্যবসায়ী ইব্রাহিম ভূইয়া বলেন, সড়কের বেহাল দশা এবং যত্রতত্র বর্জ্য ফেলে রাখার কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে সার্বক্ষণিক তীব্র যানজট লেগে থাকে। নরসিংদীর অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্য। কিন্তু এই যানজটের কারণে পণ্য পরিবহনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় অপচয় হচ্ছে, যা স্থানীয় ব্যবসা ও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরীর যে স্বপ্ন নরসিংদীবাসী দেখেন, এই সড়কটি যেন তার উল্টো পিঠ।

সজুব মিয়া নামে এক যাত্রী বলেন, সড়কটির এই দুরবস্থা নতুন কিছু নয়। দীর্ঘদিন ধরে এই অবস্থা চললেও স্থায়ী কোনো সমাধান মিলছে না। একটি আধুনিক ও শিল্পসমৃদ্ধ শহরের প্রধান প্রবেশদ্বার সড়কটি এভাবে অবহেলায় পড়ে থাকতে পারে না। নরসিংদীকে একটি পরিচ্ছন্ন, আধুনিক ও সত্যিকারের বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে এই নরসিংদী-মদনগঞ্জ সড়কটি দ্রুত সংস্কার জরুরি। পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্টটির কাজ দ্রুত শেষ করে মানুষের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দিতে হবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন ) জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক হলধর দাস বলেন, ব্যবসায়িক কারণে এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন শত শত মালবাহী ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, নছিমন এবং যাত্রীবাহী হাজার হাজার যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় পুরো সড়কজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে বিশাল বিশাল গর্তের। সামান্য বৃষ্টি হলেই এসব গর্তে পানি জমে ডোবার আকার ধারণ করে। খানাখন্দের কারণে প্রায়ই বিকল হয়ে পড়ছে যানবাহনের এক্সেলসহ নানা সরঞ্জাম, উল্টে যাচ্ছে পণ্যবাহী ট্রাকসহ যাত্রীবাহী যানবাহন। শুষ্ক মৌসুমে ধুলোবালির কারণে রাস্তা চেনা দায় হয়ে পড়ে, আর বর্ষায় এটি পরিণত হয় এক যাতনার সড়কে।

নরসিংদী জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান কেয়া বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে একটি সন্তুষ্টজনক অবস্থানে আনতে আমরা কাজ করছি। বর্জ্যের যে অব্যবস্থাপনা, এটা শুধু নান্দনিকতাই নষ্ট করে না, বরং স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরী করে মানুষের জীবনযাত্রার মানসহ সব কিছুই নষ্ট করে।

এই দুর্গন্ধ থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে একটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্লান্ট নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। এটি নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০২৫ সালের ২ ডিসেম্বর এবং শেষ করার কথা রয়েছে ২০২৭ সালের ২৪ জুন। যাতে খুব দ্রুত এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করা হয় সে ব্যাপারে জেলা প্রশাসন থেকে সার্বিক নজরদারি রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি এই সড়কটি যাতে দ্রুত সংস্কার করা হয় সে জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নরসিংদী সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোফাজ্জল হায়দার বলেন, রাস্তার দুই পাশে ময়লা ফেলার কারণে পানি জমে থাকে, যার ফলে রাস্তাটি ভেঙ্গে গেছে। আমরা রাস্তাটি খুব দ্রুতই সংস্কার করে দেব।
মানবকন্ঠ/এমআর