Image description

যে পুকুরগুলো একসময় ছিল কচুরিপানায় ঢাকা জঞ্জাল, আজ তার হিরন্ময় জলেই বদলে গেছে খুলনার পাইকগাছার চাঁদখালী ইউনিয়নের একাধিক হিন্দু অধ্যুষিত গ্রামের ভাগ্য। সকাল ও বিকালের নিয়মিত খাবারে মুখরিত পুকুরপাড়, বেকার যুবকদের ঘুরে দাঁড়ানো এবং নারীদের অর্থনৈতিক মুক্তির মধ্য দিয়ে এই প্রত্যন্ত জনপদ আজ দেশের মৎস্য মানচিত্রে তৈরি করেছে এক অনন্য রূপকথা।

খুলনার পাইকগাছা উপজেলার প্রত্যন্ত চাঁদখালী ইউনিয়নের পূর্ব গজালিয়া, উত্তর গড়ের আবাদ, দক্ষিণ গড়ের আবাদ, কালুয়া এবং বাদুড়িয়া গ্রামগুলোতে এখন শোল মাছ চাষের এক অন্যরকম কর্মযজ্ঞ চলছে। পুকুরপাড়ে কারও হাতে ধারালো বটি, কেউ নিপুণ হাতে তেলাপিয়া ও সিলভার কার্প মাছ কেটে প্রস্তুত করছেন শোল মাছের সুষম খাদ্য। ঘড়ির কাঁটা মেনে পুকুরের জলে খাবার ছড়িয়ে দিতেই শত শত রুপালি-কালচে শোল মাছ একসঙ্গে ঝাঁকে ঝাঁকে ভেসে ওঠে। এই দৃশ্য যেন মৌন ভাষায় জানিয়ে দেয়—এই জলের প্রতিটি তরঙ্গে প্রতিদিন অঙ্কুরিত হচ্ছে সাধারণ মানুষের বহুকালের অবদমিত স্বপ্ন।

জঞ্জালভরা পুকুর থেকে আয়ের হাতছানি
সরেজমিনে চাঁদখালী ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, ছোট-বড় অজস্র পুকুরে বাণিজ্যিকভাবে চলছে শোল মাছের নিবিড় চাষ। প্রতিটি পুকুরের চারপাশ বাঁশের চটা ও জালের বেষ্টনী দিয়ে ঘেরা। অথচ কয়েক বছর আগেও এই পুকুরগুলো ছিল আগাছায় ভরা। গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা রমেশ চন্দ্র সরকার বলেন, "পাঁচ-ছয় বছর আগে এই পুকুরগুলো কচুরিপানায় ঢেকে থাকত। আজ আমাদের এই অলস জলই গ্রামের পুরো চেহারা বদলে দিয়েছে।"

বেকারত্বের অভিশাপ পেরিয়ে উদ্যোক্তার মুকুট
চাকরির পেছনে না ঘুরে পাইকগাছার এই গ্রামগুলোর যুবকরা এখন উদ্যোক্তা হয়ে উঠছেন। স্থানীয় তরুণ উদ্যোক্তা প্রসেনজিৎ রায় বলেন, "নিজের শেষ সম্বলটুকু দিয়ে একটি ছোট পুকুর লিজ নিয়ে শোল মাছ চাষ শুরু করি। এই চাষ থেকে যে আয় হয়, তাতে পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে আমি এখন আত্মবিশ্বাসী।" শোল মাছ চাষের এই সফলতার পেছনে রয়েছে নারীদেরও নিরলস শ্রম। গৃহিণী পম্পা রানী জানান, মাছের খাবার প্রস্তুত করে বাড়তি যে আয় হয়, তা দিয়ে তিনি ছেলের পড়াশোনার খরচ মেটাচ্ছেন।

ক্ষুদ্র পরিসরে বৃহৎ সাফল্য
শোল মাছ চাষের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো কম জমিতে অধিক মুনাফা। স্থানীয় চাষি সুভাষ চন্দ্র মণ্ডল জানান, মাত্র ৬ শতক আয়তনের একটি পুকুরে তিনি ২ হাজার ৬০০টি শোল মাছের পোনা ছেড়েছিলেন। সাত-আট মাসের ব্যবধানে মাছগুলো একেকটি ৭০০ গ্রাম থেকে এক কেজি ওজনের হয়ে ওঠে। সমস্ত খরচ বাদ দিয়েও লাভ থাকে প্রায় দ্বিগুণ।

এই চাষকে কেন্দ্র করে এলাকায় খাদ্য প্রস্তুতকারী ও পরিবহন শ্রমিকদের ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। পাইকারি মাছ ব্যবসায়ী অনিল কুমার দাস বলেন, "খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটসহ বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা প্রতিদিন নগদ টাকায় মাছ কিনতে এখানে ছুটে আসেন।"

মৎস্য বিভাগের মূল্যায়ন
পাইকগাছা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সৈকত মল্লিক অত্যন্ত আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, "পাইকগাছার চাঁদখালীতে শোল মাছ চাষ দেশের অন্যতম সফল ও টেকসই মডেল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। পরিকল্পিতভাবে এই চাষ আরও সম্প্রসারণ করা গেলে পাইকগাছা দেশের অন্যতম শোল মাছ উৎপাদন অঞ্চলে পরিণত হবে।"

অবহেলা আর জঞ্জালকে পেছনে ফেলে পাইকগাছা আজ প্রমাণ করেছে—ইচ্ছা এবং সঠিক পরিশ্রম থাকলে জলের বুদবুদেও সোনা ফলানো সম্ভব।

মানবকণ্ঠ/ডিআর