Image description

প্রশাসনে শুরু হয়েছে দ্বিতীয় দফার ‘শুদ্ধি অভিযান’। পুলিশের বিতর্কিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক পদক্ষেপের পর এবার সিভিল প্রশাসনের ভেতরে বড় ধরনের রদবদলের পথে হাঁটছে সরকার। প্রথম ধাক্কায় একযোগে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে বিসিএস ২০তম ব্যাচের ৩২ জন সাবেক জেলা প্রশাসককে (ডিসি)। সরকারের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো সিদ্ধান্ত নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের সূচনা। ইতোমধ্যে বিসিএস ২১, ২২, ২৪ ও ২৫তম ব্যাচের একদল কর্মকর্তার সার্ভিস রেকর্ড, পদায়ন, পদোন্নতি এবং রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। চাকরির ২৫ বছর পূর্ণ হলেই পর্যায়ক্রমে তাদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সোমবার রাতে পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করে বর্তমানে যুগ্ম সচিব পদমর্যাদায় থাকা ওই ৩২ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায়। এর আগে একই অভিযোগে আরও ২২ জন সাবেক জেলা প্রশাসককে অবসরে পাঠানো হয়েছিল। ফলে এখন পর্যন্ত বিতর্কিত নির্বাচন পরিচালনার অভিযোগে মোট ৫৪ জন সাবেক ডিসি প্রশাসন থেকে বিদায় নিলেন।

অবসরে পাঠানো অধিকাংশ কর্মকর্তাই ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্বে ছিলেন। ওই নির্বাচনকে ঘিরে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগ ছিল, প্রশাসনের একটি অংশ নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে নিরপেক্ষ রাখার পরিবর্তে ক্ষমতাসীন সরকারের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল। সে সময় বিরোধী মহলে ‘দিনের ভোট রাতে’ সম্পন্ন হওয়ার অভিযোগ ব্যাপক আলোচিত হয় এবং মাঠ প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তাকে সেই প্রক্রিয়ার নেপথ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়। সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা এসব অভিযোগ, প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার সমন্বয়েই এবার কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

গণঅভ্যুত্থানের পর প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হলেও তাদের ভবিষ্যত্ নিয়ে দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তা ছিল। শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা দায়িত্ব হারালেও যুগ্ম সচিব পর্যায়ের একটি বড় অংশ কার্যত অপেক্ষমাণ অবস্থায় ছিলেন। সোমবারের সিদ্ধান্ত সেই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, ওএসডিতে থাকা অনেক কর্মকর্তার ক্ষেত্রেই এটি ছিল শেষ প্রশাসনিক ধাপ। চাকরির ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৫ ধারা প্রয়োগ করে তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, সরকারের হাতে এখন আরও কয়েকটি ব্যাচের কর্মকর্তাদের বিস্তারিত তালিকা রয়েছে। বিশেষ করে বিসিএস ২১, ২২, ২৪ ও ২৫তম ব্যাচের যেসব কর্মকর্তা সাবেক সরকারের সময় জেলা প্রশাসক, বিভাগীয় প্রশাসন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (পিএমও), স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিংবা বিভিন্ন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের কর্মকান্ড নিয়ে পর্যালোচনা প্রায় শেষ পর্যায়ে।

একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘পুলিশের পর এবার সিভিল প্রশাসনেও পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা চলছে। যাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিষয়ে ধাপে ধাপে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

এদিকে প্রশাসনের ভেতরে এই সিদ্ধান্তকে শুধু একটি আইনগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি ও পদায়নে বৈষম্যের অভিযোগ, রাজনৈতিক আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সংস্কৃতি এবং বঞ্চিত কর্মকর্তাদের ক্ষোভ—সবকিছুরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বর্তমান সিদ্ধান্তে। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে রাজনৈতিকভাবে অনুগত হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ জেলা, মন্ত্রণালয় ও নীতিনির্ধারণী পদে দায়িত্ব পেয়েছেন। বিপরীতে, বিএনপি-জামায়াতপন্থী বা রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ হিসেবে পরিচিত অনেক কর্মকর্তা বছরের পর বছর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই বঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অংশ সচিবালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে স্মারকলিপি, আবেদন ও বিক্ষোভ কর্মসূচির মাধ্যমে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জোরালো করেন। রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকেও একই দাবি অব্যাহত ছিল।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিসিএস ২০তম ব্যাচের কর্মকর্তারা ২০০১ সালের ৩১ মে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন এবং চলতি বছরের ৩০ মে তাদের চাকরির ২৫ বছর পূর্ণ হয়। সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৫ ধারা সরকারকে জনস্বার্থে ২৫ বছর পূর্ণ হওয়া যেকোনো কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর ক্ষমতা দিয়েছে। সরকার সেই বিধানই প্রয়োগ করেছে। তবে প্রশাসনের অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা বলছেন, আইনি ভিত্তি একই হলেও এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক তাত্পর্য অনেক বড়। কারণ, এটি কেবল কয়েকজন কর্মকর্তার অবসরের ঘটনা নয়; বরং প্রশাসনের ক্ষমতার কাঠামো পুনর্বিন্যাসের একটি স্পষ্ট বার্তা।

এ বিষয়ে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘সরকারি চাকরিতে ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পর বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়ার ক্ষমতা আইনগতভাবে সরকারের রয়েছে, তবে এই ক্ষমতা প্রয়োগে স্বচ্ছতা, ন্যায়সংগততা এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। তিনি মত দিয়েছেন, প্রশাসনে শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য আইনের ব্যবহার হতে পারে, কিন্তু তা যেন রাজনৈতিক বিবেচনার হাতিয়ার না হয়।’

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, বাধ্যতামূলক অবসর সরকারি চাকরির স্বীকৃত বিধান, তবে এটি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়। সরকার যখন মনে করে জনস্বার্থে কোনো কর্মকর্তাকে আর দায়িত্বে রাখা প্রয়োজন নেই, তখন এই বিধান প্রয়োগ করা হয়। তবে এ ধরনের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে প্রশাসনের পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতার প্রশ্নও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।