Image description

কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার থানাহাট ইউনিয়নে টিআর, কাবিখা ও কাবিটা কর্মসূচির আওতায় নেওয়া বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নথিতে অধিকাংশ প্রকল্প শতভাগ বাস্তবায়ন দেখিয়ে বরাদ্দের সমুদয় অর্থ উত্তোলন করা হলেও সরেজমিনে গিয়ে মিলেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। কোথাও একই সড়ককে ভিন্ন ভিন্ন নামে একাধিক প্রকল্প দেখিয়ে অর্থ লুট করা হয়েছে, কোথাও আবার অস্তিত্বহীন কবরস্থান সংস্কারের নামে টাকা তোলা হয়েছে। এমনকি পুরোনো সিসি ঢালাই সড়ককে নতুন কাজ হিসেবে দেখিয়েও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

এসব অনিয়মে ক্ষুব্ধ হয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগের পর বিষয়টি এখন পুরো এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, উন্নয়নের সুফল কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ রয়েছে, বাস্তবে সাধারণ মানুষ কোনো সুফল পাচ্ছে না।

উপজেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইট ও সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চিলমারী উপজেলার ৬টি ইউনিয়নে টিআর, কাবিখা ও কাবিটার আওতায় মোট ১২৪টি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে কেবল থানাহাট ইউনিয়নেই ৪৪টি প্রকল্পের বিপরীতে প্রায় ৯৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। গ্রামীণ সড়ক, কবরস্থান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপাসনালয় সংস্কারের কথা বলে এই বিপুল অঙ্কের অর্থ অনুমোদন করা হলেও দু-একটি প্রকল্পে নামমাত্র কাজ করে বাকি সব অর্থ পকেটে পুরেছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, ইউনিয়নের বজরা তবকপুর এলাকায় 'ইউসুফ আলী মুক্তিযোদ্ধার বাড়ি থেকে কালিরপাঠ মন্দির' এবং 'ইউসুফ মিলিটারীর বাড়ি থেকে আহম্মেদ আলী মিলিটারীর বাড়ি'—একই পথের দুটি স্থানে কায়দা করে নাম বদলে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা করে মোট ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়েছে। অথচ বাস্তবে সড়কটিতে কোনো কাজের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া বজরাতবকপুর মজাইডাঙা জামে মসজিদ সংলগ্ন কবরস্থান সংস্কারে ৫ লাখ ৭০ হাজার ৫২৪ টাকা বরাদ্দ দেখানো হলেও সেখানে কোনো সংস্কার কাজের অস্তিত্ব মেলেনি। একই এলাকার 'আজমের বাড়ি হতে আইয়ুবের বাড়ি' মুখী রাস্তা সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য ৫ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ দেওয়া হলেও আগের করা সিসি ঢালাইকে নতুন কাজ হিসেবে উপস্থাপন করে বরাদ্দ তুলে নেওয়া হয়েছে।

এলাকাবাসী কৃঞ চন্দ্র, হরিশ চন্দ্র, বজলার রহমান ও তানিয়া খাতুনসহ অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বর্ষা আসলে এই রাস্তাটি চলাচলের একদম অনুপযোগী হয়ে পড়ে। অথচ এই সড়কেই দুটি প্রকল্প দেওয়া হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি।” তারা অবিলম্বে রাস্তাটি সংস্কারের দাবি জানান।

ইউনিয়নটির ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মাচাবান্দা এলাকায় ‘মেইন রাস্তা থেকে প্রিন্সের বাড়ি’ পর্যন্ত ২ লাখ ২৪ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে সেই রাস্তার কোনো চিহ্নই নেই। সেখানে যাতায়াতের জন্য মানুষ বর্তমানে অন্যের উঠান ব্যবহার করছে। একই ওয়ার্ডের প্রমানিক পাড়ায় পুকুরপাড়ে গাইড ওয়াল নির্মাণের জন্য ৩ লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও বাস্তবে সেখানে শুধু পুরোনো ঢেউ টিন ও বাঁশ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, কোনো মাটি ফেলা হয়নি। তবে দায়সারাভাবে সড়কে কয়েক গাড়ি মাটি ফেলা হয়েছে মাত্র।

একই ওয়ার্ডের 'মাচাবান্দা কালামের চাতাল মেইন রোড হতে ডিপঘর পর্যন্ত' রাস্তা সংস্কার ও উন্নয়নে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও স্থানীয় বাসিন্দা হামিদুল ইসলাম ও জয়নাল হক জানান, পূর্ববর্তী ইউপি সদস্যের আমলে মাটি কাটা হলেও বর্তমান প্রকল্পে কোনো কাজই হয়নি।

অন্যদিকে, ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ছোট কুষ্টারী এলাকায় 'আব্দুল বারী সরকারের বাড়ি থেকে উমর হাজির বাড়ি' পর্যন্ত সড়ক সংস্কারে ৩ লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, সেখানে আগে থেকেই এইচবিবি (ইটের সলিং) প্রকল্পের কাজ চলমান থাকলেও একই স্থানকে কাবিটা প্রকল্প দেখিয়ে বরাদ্দের অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। এছাড়া 'মন্ডপাড়া পাকা রাস্তা থেকে আব্দুল কাইয়ুমের বাড়ি পর্যন্ত' রাস্তা সংস্কারে ২ লাখ ৯ হাজার ১০০ টাকা এবং একই সড়ককে ভিন্ন নামে দেখিয়ে আরও ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও স্থানীয়রা জানান, সড়কটি আগে থেকেই সিসি ঢালাই করা থাকায় নতুন কোনো কাজ সেখানে হয়নি। একই ধরনের ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে ২ নম্বর ওয়ার্ডের কিসামতবানু এলাকাসহ উপজেলার বিভিন্ন প্রান্তে।

ভুক্তভোগী এলাকাবাসী এসব ভুয়া প্রকল্পের সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রশাসনের নিকট জোর দাবি জানিয়েছেন।

মানবকণ্ঠ/ডিআর