রক্তাক্ত জুলাইয়ের স্মৃতি এখনো অম্লান
শিবচরে শহীদদের আত্মত্যাগ, আহতদের বেদনা জীবন্ত
২০২৪ সালের রক্তাক্ত জুলাইয়ের স্মৃতি দুই বছর পরও তাড়া করে বেড়াচ্ছে মাদারীপুরের শিবচরবাসীকে। সময়ের প্রবাহে অনেক কিছু বদলে গেলেও সেই আন্দোলনের দিনগুলোর ক্ষত এখনো শুকায়নি। উপজেলার রাজারচর গ্রামের হৃদয় হোসেন ও ভান্ডারিকান্দি গ্রামের নাইমুর রহমানের আত্মত্যাগ শিবচরের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। একই সঙ্গে আন্দোলনে আহতদের শারীরিক ক্ষত, মানসিক যন্ত্রণা এবং পরিবারগুলোর দীর্ঘশ্বাস আজও বহন করছে সেই ভয়াল সময়ের স্মৃতি।
জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে শিবচরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে আহত ব্যক্তি, শহীদ পরিবার ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে সেই সময়ের নানা বেদনাবিধুর ঘটনা। তাঁদের ভাষ্য, সময় এগিয়ে গেলেও সেই দিনের আতঙ্ক, শোক ও হারানোর বেদনা এখনো তাঁদের মনে গভীরভাবে গেঁথে আছে।
স্থানীয়দের দাবি, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় শিবচর পৌর মার্কেট এবং বাঁশকান্দি ইউনিয়নের শেখপুর নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ছাত্র-জনতার কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, এ সময় লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেলের হামলায় অন্তত ছয়জন আহত হন। কয়েকজন আন্দোলনকারীকে আটক করে নির্যাতনের অভিযোগও ওঠে।
বিদেশে অবস্থানরত এক সাবেক ইউনিয়ন ছাত্রলীগ কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমার এলাকার এক ছোট ভাই, যে আমার সঙ্গেই ছাত্রলীগ করত, তার আপন ছোট ভাইকে আমাদেরই থানা ছাত্রলীগের কিছু কর্মী নির্যাতন করেছে। আমি অনেক চেষ্টা করেও তাদের থামাতে পারিনি। এত ছোট একটি ছেলেকে এভাবে নির্যাতন করা উচিত ছিল না।”
আন্দোলনে আহত বাঁশকান্দি ইউনিয়নের ডা. জুবায়ের বলেন, “ছাত্রদের ওপর হামলার প্রতিবাদে আমরা শেখপুর নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মানববন্ধন করছিলাম। এ সময় শিবচর থেকে আসা ছাত্রলীগের কর্মীরা আমাদের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালায়। তিন-চারজন মিলে আমাকে মারধর করে। এতে আমি প্রায় পাঁচ দিন অসুস্থ ছিলাম।”
পৌর মার্কেট এলাকায় আহত এক ছাত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বৃষ্টির মধ্যেই আমরা প্রেসক্লাবের সামনে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করছিলাম। হঠাৎ কয়েকজন হামলা চালায়। তারা হাতুড়ি, লাঠি ও কোমরের বেল্ট ব্যবহার করে। নারী শিক্ষার্থীরাও হামলার শিকার হন। কয়েকজনকে আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ে নিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। পরে নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেকেই এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, তৎকালীন চিফ হুইপ নূর-ই আলম চৌধুরীর রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে আন্দোলনের সময় শিবচরে রাজপথে নামা ছাত্র-জনতার জন্য পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এ কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সাহস পাননি বলে তাঁরা জানান।
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ঢাকার বাড্ডা এলাকায় আন্দোলনের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন শিবচরের রাজারচর গ্রামের ১৭ বছর বয়সী হৃদয় হোসেন। একই আন্দোলনে প্রাণ হারান ভান্ডারিকান্দি গ্রামের নাইমুর রহমান। তাঁদের মৃত্যু শুধু দুটি পরিবারের নয়, পুরো শিবচরবাসীর জন্যই এক অপূরণীয় ক্ষতি।
দুই বছর পরও শহীদ হৃদয় হোসেনের বাড়িতে শোকের আবহ স্পষ্ট। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে বাবা শাহ আলম হাওলাদার মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। তিনি বলেন, “আমার ছেলে আর কোনোদিন বাড়ি ফিরবে না, কোনোদিন ‘বাবা’ বলে ডাকবে না। বাবা হয়ে সন্তানের লাশ কাঁধে নেওয়ার যে কী যন্ত্রণা, তা কাউকে বোঝাতে পারব না। কোনো বাবা কি কখনো ভাবেন, তাঁকে তাঁর কলিজার টুকরোর লাশ কাঁধে নিতে হবে?”
মা নাছিমা আক্তারের কণ্ঠেও এখনো সন্তানের জন্য বুকভাঙা হাহাকার। তিনি জানান, সরকারি ভাতার অর্থ দিয়ে কোনোভাবে সংসার চলছে। তাঁর দাবি, শহীদ পরিবারগুলোর স্থায়ী পুনর্বাসন, নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা এবং শিবচরে শহীদদের স্মরণে কোনো সড়ক, স্থাপনা বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হোক।
জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে শিবচরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ দুই শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে আন্দোলনে আহতদের উন্নত চিকিৎসা, যথাযথ পুনর্বাসন, ঘটনার বিচার এবং শহীদ পরিবারগুলোর দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের মতে, শিবচরের দুই শহীদের আত্মত্যাগ এবং আহতদের ত্যাগ শুধু একটি আন্দোলনের ইতিহাস নয়; এটি অধিকার, সাহস ও আত্মমর্যাদার জন্য সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাঁদের স্মৃতি সংরক্ষণ, যথাযথ মূল্যায়ন এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরাই হবে তাঁদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।




Comments