বারবার গ্রেপ্তার, জামিনে মুক্তি, ফের মাদক কারবার
রাজশাহীতে তিন মাসে গ্রেপ্তার ৫৮৩, বিচারাধীন ২৫ হাজার ৬৭১ মামলা
ভোর থেকে গভীর রাত। সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে নগরীর অলিগলি—মাদকের আখড়া হিসেবে চিহ্নিত স্থান কিংবা বাসাবাড়ি, কোথাও থেমে নেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান। কোথাও উদ্ধার হচ্ছে হেরোইন, কোথাও ইয়াবা, গাঁজা কিংবা দেশীয় মদ। গ্রেপ্তার হচ্ছেন মাদক কারবারি ও সেবনকারীরা। অভিযানের পর পুলিশের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সাফল্যের তালিকাও দীর্ঘ হচ্ছে। তবে এসব অভিযানের আড়ালে থেকেই যাচ্ছে বড় প্রশ্ন—গ্রেপ্তারের পর কী হচ্ছে?
পুলিশ ও সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, মাদক মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া অনেক আসামি অল্প সময়ের মধ্যেই জামিনে বেরিয়ে আবারও একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। কারও বিরুদ্ধে রয়েছে পাঁচটি, কারও ১০টি, এমনকি ১৫টিরও বেশি মাদক মামলা। ফলে একই ব্যক্তিকে বারবার গ্রেপ্তার করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী; কিন্তু দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার কারণে মাদকের কারবার পুরোপুরি থামছে না। অর্থাৎ একই মুখ, একই অপরাধ—শুধু বদলাচ্ছে গ্রেপ্তারের তারিখ।
এক মামলার পেছনে আট বছরের গল্প
রাজশাহীর গোদাগাড়ীর সুলতানগঞ্জের একটি মামলাই পরিস্থিতির গভীরতা বোঝাতে যথেষ্ট। ২০১৮ সালের ১০ জুলাই র্যাব অভিযান চালিয়ে ১ কেজি ২১০ গ্রাম হেরোইনসহ চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা গ্রামের নুরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে। তাঁর বিরুদ্ধে এর আগেও তিনটি মাদক মামলা ছিল। অভিযোগ রয়েছে, কয়েক মাসের মধ্যেই জামিনে মুক্ত হয়ে নুরুল ইসলাম ফের মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েন। মামলাটি বর্তমানে রাজশাহী বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে বিচারাধীন। প্রায় আড়াই বছর আগে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হলেও ১৪ সাক্ষীর মধ্যে এখন পর্যন্ত সাক্ষ্য দিয়েছেন মাত্র দুজন। একাধিকবার সমন জারি করা হলেও অধিকাংশ সাক্ষী আদালতে হাজির হননি। আসামির নিয়মিত আদালতে হাজিরা না দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। একটি মাদক মামলার বিচার যেখানে বছরের পর বছর এগোয় না, সেখানে অভিযান ও গ্রেপ্তারের চূড়ান্ত ফল কতটা কার্যকর—সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে।
বিচারাধীন ২৫ হাজার ৬৭১ মামলা
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহীর বিভিন্ন আদালতে বর্তমানে ২৫ হাজার ৬৭১টি মাদক মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের অধীন আদালতগুলোতে ৬ হাজার ৭৪৯টি, মহানগর দায়রা জজ আদালতে ৭ হাজার ১৬০টি, চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ৯ হাজার ৩৫৫টি এবং জেলা ও দায়রা জজসহ অন্যান্য আদালতে আরও ৩ হাজার ৬০৭টি মামলা রয়েছে। বিপুলসংখ্যক মামলার চাপে বিচারপ্রক্রিয়ার গতি ধীর হয়ে পড়ার পাশাপাশি সাক্ষীদের অনুপস্থিতি, তদন্তে বিলম্ব এবং তদন্তকারী পুলিশ সদস্যদের বদলির মতো বিষয় মামলার নিষ্পত্তি দীর্ঘায়িত করছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ফলে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হলেও মামলার চূড়ান্ত পরিণতি দেখতে আসামি ও রাষ্ট্র—উভয় পক্ষকেই অপেক্ষা করতে হচ্ছে বছরের পর বছর।
তিন মাসে গ্রেপ্তার ৫৮৩
মাদকের বিরুদ্ধে অবশ্য অভিযান থেমে নেই। আরএমপি, রাজশাহী জেলা পুলিশ ও র্যাবের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল, মে ও জুন—এই তিন মাসে মাদক-সংক্রান্ত ৪৮২টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ৬৭৪ জনকে। গ্রেপ্তার হয়েছেন ৫৮৩ জন। এই সময়ে প্রায় ৭৫ কেজি গাঁজা, সাড়ে ১০ হাজারের কাছাকাছি ইয়াবা, প্রায় ৭ হাজার নিষিদ্ধ ট্যাবলেট এবং ২ হাজার ৭০০টির বেশি বোতল অ্যালকোহল উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া মাদকের আনুমানিক বাজারমূল্য এক কোটি টাকার বেশি। ছয় মাসের হিসাব আরও বড়। এ সময়ে প্রায় এক হাজার মাদক মামলায় এক হাজার ১০০ জনের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
বিশেষ অভিযানেও ধরা পড়ছে কারবারিরা
গত ২১ থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত সাত দিনব্যাপী বিশেষ অভিযান চালায় রাজশাহী জেলা পুলিশ। রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মো. আশিক সাঈদের নির্দেশনায় এবং পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাঈমুল হাছানের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এ অভিযানে মাদক উদ্ধারের পাশাপাশি বিভিন্ন মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানের প্রথম দিনেই ২ দশমিক ৫ লিটার দেশীয় মদ, ১১০টি ইয়াবা ও ১৯০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করা হয়। মাদক-সংক্রান্ত অভিযোগে পাঁচজন এবং বিভিন্ন পরোয়ানাভুক্ত সাতজনসহ মোট ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, মাদকের পাশাপাশি অস্ত্র, বিস্ফোরক, চোরাচালান পণ্য এবং জিআর, সিআর ও সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের বিরুদ্ধেও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
‘পুলিশের কাজ গ্রেপ্তার করা, শাস্তি দেওয়া আদালতের’
রাজশাহী জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, জেলা পুলিশ মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছে। নিয়মিত অভিযান ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে অভিযানের সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, পুলিশের দায়িত্ব আসামিকে আটক করে আইনের আওতায় নেওয়া। শাস্তি দেওয়া বিচার বিভাগের বিষয়। অনেক আসামি অল্প সময়ের মধ্যেই জামিনে বেরিয়ে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। আরএমপির মুখপাত্র ও উপপুলিশ কমিশনার মো. গাজিউর রহমান জানান, মাদক কারবারিদের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের অবস্থান ও গতিবিধি নজরদারিতে রেখে অভিযান চালানো হচ্ছে। কয়েকজনের বিরুদ্ধে ১৫টি পর্যন্ত মাদক মামলা রয়েছে। এরপরও তারা জামিনে মুক্ত হচ্ছেন। রাজশাহী মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবিরও একই সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর ভাষ্য, কারও বিরুদ্ধে পাঁচ থেকে ১০টি, আবার কারও বিরুদ্ধে ১৬টি পর্যন্ত মাদক মামলা রয়েছে। দ্রুত বিচার ও কঠোর আইনি কাঠামো নিশ্চিত করা গেলে পুনরায় অপরাধে জড়ানোর প্রবণতা কমানো সম্ভব।
শুধু গ্রেপ্তার নয়, আঘাত করতে হবে মাদকের অর্থনীতিতে
রাজশাহী জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাঈমুল হাছান বলেন, সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশের পথ বন্ধ করতে বিজিবির সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে। মাদক ব্যবসা করে যারা বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগও রয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মেহেদী হাসানের মতে, বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাবও অনেককে মাদক কারবারে টেনে নিচ্ছে। পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না থাকলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেও কেউ কেউ আবার পুরোনো পেশায় ফিরে যেতে পারেন।
চার্জশিটেই যখন বিলম্ব
রাজশাহী বার অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি ও জজ কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী পারভেজ তৌফিক জাহেদী বলেন, মাদক মামলার অন্যতম বড় দুর্বলতা তদন্তপর্বেই। হাতেনাতে মাদকসহ গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে প্রায় ৯০ শতাংশ মামলায় সেই সময়সীমা মানা হয় না। তিনি আরও বলেন, ৫ আগস্টের পর তদন্তকারী পুলিশ সদস্যদের বদলি হয়ে যাওয়ায় অনেক মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণেও জটিলতা তৈরি হয়েছে। করোনাকালীন বিচারিক স্থবিরতার প্রভাবও এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
গ্রেপ্তার-জামিনের চক্র ভাঙবে কীভাবে?
রাজশাহীতে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানের পরিসর বাড়ছে। বাড়ছে গ্রেপ্তার এবং উদ্ধার হওয়া মাদকের পরিমাণও। একই সঙ্গে বাড়ছে বিচারাধীন মামলার পাহাড়। ফলে প্রশ্ন উঠছে—মাদকবিরোধী লড়াই কি শুধু গ্রেপ্তার পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি মামলার শেষ পরিণতিও নিশ্চিত হবে? সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান চালালেই হবে না। সীমান্তে নজরদারি জোরদার, মাদক কারবারিদের অর্থের উৎসে আঘাত, দ্রুত তদন্ত ও চার্জশিট দাখিল, সাক্ষীদের আদালতে উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি আসামিদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে হবে।নইলে পুলিশের হাতে একই আসামির বারবার গ্রেপ্তার, কিছুদিন পর জামিনে মুক্তি এবং ফের মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ার চক্রই মাদক নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে থাকবে। অভিযান চলবে, গ্রেপ্তারও হবে। কিন্তু মাদকমুক্ত রাজশাহীর জন্য শেষ পর্যন্ত প্রয়োজন—মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং অপরাধীকে পুনরায় অপরাধে ফেরার পথ বন্ধ করা।
এসএ




Comments