নেশার ধোঁয়ায় পুড়ছে টাকা
নোট পুড়িয়ে নেশা! পাইকগাছায় ইয়াবার ভয়ংকর চিত্র
১০, ২০, ৫০ কিংবা ১০০ টাকার নোট—যে অর্থ দিয়ে মেলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, মেটানো যায় পরিবারের ছোটখাটো প্রয়োজন, সেই টাকার নোটের কোনা পুড়ে যাচ্ছে মাদকের আগুনে। খুলনার পাইকগাছায় ইয়াবা সেবনের সময় টাকার নোটের কোনা পুড়িয়ে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
একটি নোটের মূল্যমান হয়তো কম, কিন্তু সেটি পুড়ে গেলে নষ্ট হয় ব্যক্তির অর্থ, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পরিবার ও সমাজ। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রের প্রচলিত মুদ্রা এবং বাড়ে ক্ষতিগ্রস্ত নোট প্রতিস্থাপন ও মুদ্রা ব্যবস্থাপনার চাপ। মাদকের ভয়াবহতার মধ্যে টাকার নোট পোড়ানোর এমন অভিযোগ তাই নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
নোট পুড়িয়ে নেশা—কী বলছে মাঠের চিত্র?
স্থানীয়ভাবে পাওয়া অভিযোগ ও বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইয়াবা সেবনের সময় কিছু ব্যবহারকারী টাকার নোটসহ বিভিন্ন উপকরণ আগুনে পুড়িয়ে ব্যবহার করছেন। বিশেষ করে ১০, ২০, ৫০ ও ১০০ টাকার নোট ব্যবহারের অভিযোগ সামনে এসেছে।
তবে পাইকগাছায় এ ধরনের প্রবণতা কতটা ব্যাপক এবং কোন কোন এলাকায় এর বিস্তার রয়েছে, তা নিশ্চিত করতে আরও অনুসন্ধান প্রয়োজন। কারণ মাদক সেবনের পদ্ধতি নিয়ে প্রচলিত বিভিন্ন তথ্যের সঙ্গে স্থানীয় অভিযোগের পার্থক্য থাকতে পারে। ফলে প্রত্যক্ষ প্রমাণ, ছবি বা ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যের মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করা জরুরি।
নেশার পেছনে যাচ্ছে পরিবারের টাকা
মাদকাসক্তির অন্যতম বড় ক্ষতি হচ্ছে অর্থনৈতিক বিপর্যয়। শুরুতে সামান্য অর্থ ব্যয় হলেও নিয়মিত নেশার অভ্যাস তৈরি হলে ব্যয় বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে এর প্রভাব পড়ে পুরো পরিবারের ওপর।
পাইকগাছার কয়েকজন অভিভাবকের অভিযোগ, নেশায় জড়িয়ে পড়া সন্তানদের কারণে অনেক পরিবারকে আর্থিক সংকটে পড়তে হচ্ছে। কেউ পরিবারের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছে, কেউ নিজের উপার্জন নেশায় ব্যয় করছে। এমনকি পরিবারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বিক্রি করে নেশার টাকা জোগাড় করার অভিযোগও রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “নেশা যখন অভ্যাসে পরিণত হয়, তখন টাকার মূল্যও অনেকের কাছে থাকে না। পরিবার থেকে টাকা নেওয়া, নিজের আয় শেষ করা—সবই তখন স্বাভাবিক হয়ে যায়।”
পাইকগাছায় তরুণদের নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদকের সহজলভ্যতা তরুণ প্রজন্মের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। বন্ধুদের আড্ডা, কৌতূহল কিংবা অসৎ সঙ্গের মাধ্যমে অনেকেই প্রথমে নেশার সংস্পর্শে আসে। পরে ধীরে ধীরে তা নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
মাদকাসক্তির কারণে পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়া, কর্মজীবনে অনিয়ম, পারিবারিক অশান্তি এবং অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। ফলে মাদকের সমস্যা শুধু একজন ব্যক্তির সমস্যা নয়; এটি পরিবার ও সমাজের নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
নোট পোড়ানোর অভিযোগের আড়ালে বড় প্রশ্ন
একটি ১০ টাকার নোট পুড়িয়ে ফেলা হয়তো আর্থিক দিক থেকে বড় ক্ষতি নয়। কিন্তু কেন একজন মানুষ নিজের হাতে থাকা অর্থ আগুনে পুড়িয়ে ফেলছে—প্রশ্নটি সেখানেই।
এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মাদকাসক্তির মানসিক ও সামাজিক প্রভাব। নেশা একজন মানুষের অর্থনৈতিক মূল্যবোধ, পারিবারিক দায়িত্ববোধ এবং সামাজিক আচরণকে কতটা বদলে দিতে পারে—টাকার নোট পোড়ানোর অভিযোগ তারই একটি উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত হিসেবে সামনে আসছে।
শুধু সেবনকারী নয়, খুঁজতে হবে সরবরাহের উৎস
মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু সেবনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে সমস্যার মূল সমাধান হবে না। মাদক কোথা থেকে আসছে, কারা সরবরাহ করছে, কীভাবে পাইকগাছায় ঢুকছে এবং স্থানীয় পর্যায়ে কারা এর সঙ্গে জড়িত—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে মাদক উদ্ধার ও গ্রেপ্তার হলেও সরবরাহের মূল চেইন অক্ষত থাকলে একই এলাকায় আবার মাদক ফিরে আসার আশঙ্কা থাকে। তাই মাদকবিরোধী অভিযানের পাশাপাশি সরবরাহকারী ও সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার ওপর জোর দেওয়ার দাবি উঠেছে।
প্রশাসনের নজরদারি কতটা কার্যকর?
পাইকগাছায় মাদকবিরোধী অভিযান, মামলা, গ্রেপ্তার ও উদ্ধারের সরকারি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে। গত কয়েক বছরে কত পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে, কতজন গ্রেপ্তার হয়েছে, কতটি মামলা হয়েছে এবং এসব মামলার বিচারিক অগ্রগতি কতদূর—এসব তথ্য এখন গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ একজন মাদকসেবীকে গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না; তাকে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনাও জরুরি।
আগুন শুধু নোটে নয়, পুড়ছে ভবিষ্যৎ
১০ টাকা থেকে ১০০ টাকা—একটি একটি করে নোট হয়তো আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এর চেয়েও বড় ক্ষতি হচ্ছে একজন তরুণের ভবিষ্যৎ নষ্ট হওয়া।
মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ। পাশাপাশি মাদক সরবরাহের উৎস চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং আসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়ানো জরুরি।
পাইকগাছায় টাকার নোট পোড়ানোর অভিযোগ তাই নিছক অর্থের অপচয়ের গল্প নয়—এটি মাদকাসক্তির বিস্তার নিয়ে একটি বড় সতর্কবার্তা। প্রশ্ন এখন একটাই—নোটের আগুন নেভানোর পাশাপাশি ইয়াবার আগুন নেভাতে কার্যকর ব্যবস্থা কবে?
এসএ




Comments